মেসির বিদায়ে স্তব্ধ ফুটবল দুনিয়া

মেসির বিদায়ে স্তব্ধ ফুটবল দুনিয়া

ফন্ট সাইজ:

একদিন তো বিদায় নিতেই হয়। কিংবদন্তিরও। কিন্তু কিছু বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়- একটি যুগের সমাপ্তি। লিওনেল মেসির বিদায়ও যেন তেমনই এক মুহূর্ত। যে বাঁ পায়ের জাদুতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোটি কোটি মানুষ মুগ্ধ হয়েছেন, যে মানুষটি একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন, অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, সেই মেসির অধ্যায় এবার শেষের পথে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে নিজেই আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। দূর থেকে দেখলে পোস্টটি হয়তো খুব সাধারণ। অবসর নিতে যাওয়া একজন ফুটবলার যেমন বিদায়বার্তা দেন, অনেকটা তেমনই। কিন্তু মেসির বিদায়বার্তার গল্পটা এতটা সরল নয়। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’ সেই রহস্যের কিছুটা উন্মোচন করেছে। পোস্টের সঙ্গে একটি ছবি দিয়েছিলেন মেসি। নোটপ্যাডের তিনটি কাগজ, পাশে একটি কলম। তিনটি কাগজ জুড়ে লেখা তার বিদায়বার্তা। সবই বড় হাতের অক্ষরে। মেসি জানিয়েছেন, গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের দুইদিন পরই তিনি এই বার্তা লিখেছিলেন। এরপর বাবাকে হারানোর পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন জাতীয় দল থেকে বিদায়ের।

মেসিকে ছাড়া ফুটবল কল্পনা করাই কঠিন। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ, আনন্দ, হতাশা আর ভালোবাসার সঙ্গে মিশে আছে একটি নাম- মেসি। বার্সেলোনার নীল-লাল জার্সি থেকে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে নতুন অধ্যায়- যেখানেই গেছেন, রেখে গেছেন নিজের অমোচনীয় ছাপ। ছোট্ট শহর রোজারিও থেকে উঠে আসা সেই ছেলেটি একদিন ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন- গল্পটা যেন রূপকথা। শারীরিক উচ্চতায় ছোট ছিলেন, কিন্তু স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। প্রতিকূলতা পেরিয়ে বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ায়ে শুরু হয়েছিল তার পথচলা। তারপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্ব ফুটবলের ‘লিও’।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০০৫ সালে এক কিশোর প্রথমবার বিশ্বকে জানান দিয়েছিল- তার পায়ের কাছে বল থাকলে সময় যেন একটু ধীর হয়ে যায়। তবে জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ে মেসির পথ কখনোই সহজ ছিল না। সে সময় আর্জেন্টিনা মানেই ছিল দিয়েগো ম্যারাডোনা। মেসিকে বলা হতো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি।

তিনি গোল করতেন, অ্যাসিস্ট করতেন, ডিফেন্স ভাঙতেন, একাই ম্যাচের চেহারা বদলে দিতেন। তবু প্রশ্ন উঠতো- ক্লাবের মেসি কোথায়? দেশের জার্সিতে কেন তিনি একই রকম নন? প্রশ্নের যথেষ্ট কারণও ছিল। বার্সেলোনায় তার সাফল্যের তালিকা এত দীর্ঘ যে গুনতে গেলেও শেষ হয় না। লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লীগে, কোপা দেল রে, অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার- সবই এসেছে তার ঝুলিতে। শুধু জাতীয় দলের জার্সিতে বড় কোনো ট্রফি আসছিল না। তারপর এলো ২০১৪। ব্রাজিল। বিশ্বকাপ। ফাইনাল। মারাকানা। একটি দেশ ২৮ বছর ধরে অপেক্ষা করছে। আর একজন মানুষ দাঁড়িয়ে তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের একেবারে দরজায়। সেখানেও মেসি পারলেন না। জার্মানি জিতলো বিশ্বকাপ। মেসির হাতে উঠলো গোল্ডেন বল। কিন্তু তার চোখে তখন হয়তো একটাই প্রশ্ন- ‘আর কতো দূর গেলে তবে আমি আমার দেশের জন্য যথেষ্ট হবো?’

২০১৫। কোপা আমেরিকার ফাইনাল। চিলির কাছে হার। টাইব্রেকারে মেসির পেনাল্টি মিস।
তারপর ২০১৬। আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আবার চিলি। আবার টাইব্রেকার। আবার হার। এবার মেসি কাঁদলেন। এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে ঘোষণা করে ফেললেন, জাতীয় দল থেকে সরে যাচ্ছেন। বিশ্বের সেরা ফুটবলার। ক্লাব ফুটবলে যা কিছু জেতা সম্ভব, প্রায় সবই জিতে ফেলেছেন। অথচ নিজের দেশের হয়ে একটি বড় ট্রফি নেই। সেই অভাবটাই যেন আর্জেন্টিনার চোখে তার সমস্ত অর্জনকে ছোট করে দিচ্ছিল। সেই সময় হয়তো মেসি বুঝতে পারেননি- কিছু গল্পের শেষটা লিখতে এত সময় লাগে। কিছু মানুষকে কিংবদন্তি হতে হলে আগে অনেকবার ভাঙতে হয়।

তারপর এলো ২০২১। মারাকানা আবার। আবার ফাইনাল। তবে এবার প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। একটি দেশ তাকিয়ে আছে সেই ছোট্ট ১০ নম্বরের দিকে।
শেষ বাঁশি বাজলো। মেসি মাটিতে বসে পড়লেন। চোখে জল। মুখে হাত। চারপাশে সতীর্থরা ছুটে আসছেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী মানুষটি বোধ হয় সেদিন সবচেয়ে হালকা হয়ে গিয়েছিলেন। যে মানুষটির নামে এতদিন একটি অভিযোগ ছিল- দেশের হয়ে কিছু জেতেননি- সেদিন সেই অভিযোগটাই যেন চিরতরে মারা গেল।
কিন্তু গল্প তখনো শেষ হয়নি। কারণ, মেসির জন্য আরও বড় একটি দৃশ্য বোধ হয় লিখে রেখেছিল সময়। ২০২২। কাতার বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু। তারপর একে একে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া। আর প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে মেসি যেন বয়সকে অস্বীকার করতে লাগলেন। ৩৫ বছর বয়সী একজন মানুষ পুরো একটি জাতির স্বপ্ন নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।

তারপর ফাইনাল। সামনে ফ্রান্স। এক পাশে কিলিয়ান এমবাপ্পে, অন্য পাশে মেসি। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা। আর মেসির সামনে জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ সুযোগ। নব্বই মিনিটে শেষ হয়নি। অতিরিক্ত সময়েও নয়। টাইব্রেকারে গিয়ে থামলো মহাকাব্য। শেষ পর্যন্ত মেসির হাতেই উঠলো বিশ্বকাপের ট্রফি। সেই মুহূর্তে তিনি যেন শুধু একটি ট্রফি তুলছিলেন না। তুলছিলেন দুই দশকের অপেক্ষা, অসংখ্য সমালোচনা, ব্যর্থতার যন্ত্রণা আর অপূর্ণতার ভার। যে প্রশ্নটা বছরের পর বছর তাকে তাড়া করেছে, সেদিন তার উত্তর মিলেছিল। মেসি যথেষ্ট ছিলেন। বরং তার চেয়েও বেশি।

তারপর ২০২৪। আরেকটি কোপা আমেরিকা। আরেকটি ফাইনাল। আরেকটি ট্রফি। এবার আর কেউ প্রশ্ন করেনি- মেসি দেশের হয়ে কী করেছেন?
কারণ প্রশ্ন করার মতো কিছুই আর বাকি ছিল না। একটি বিশ্বকাপ। দু’টি কোপা আমেরিকা। অলিম্পিক সোনা। বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। একটি প্রজন্মের স্বপ্নের মানুষ। তবে মেসির গল্পের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হয়তো ট্রফিগুলো নয়। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার- তিনি হেরে গিয়েও থেকে গিয়েছিলেন। তিনি অপমানিত হয়েও ফিরে এসেছিলেন। তিনি কেঁদেও আবার জার্সিটা পরেছিলেন। তিনি অবসর ঘোষণা করেও আবার ফিরেছিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, কিছু ভালোবাসা থেকে পালানো যায় না। আর্জেন্টিনা ছিল তেমনই এক ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার সঙ্গেই এবার সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আর মেসির বিদায়ের সঙ্গে শেষ হবে শুধু একটি ক্যারিয়ার নয়।

শেষ হবে আমাদের শৈশব-কৈশোরের একটি বড় অংশ। যারা রাত জেগে বার্সেলোনার খেলা দেখেছেন, যারা আর্জেন্টিনার খেলা মানেই মেসির জাদুর অপেক্ষায় থেকেছেন, যারা বিশ্বকাপের রাতে তার প্রতিটি স্পর্শে শিহরিত হয়েছেন- তাদের কাছে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি স্মৃতি। একটি সময়। একটি প্রজন্মের আবেগ। হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার আসবেন। কেউ তার রেকর্ড ভাঙবেন। কেউ হয়তো আরও বেশি গোল করবেন। কেউ হয়তো আরও বেশি ট্রফি জিতবেন। কিন্তু মেসির মতো করে ফুটবলকে এতটা শিল্পে পরিণত করতে পারবেন কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ মেসি শুধু গোল করেননি। তিনি ফুটবলকে সুন্দর করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন, বল পায়ে দৌড়ানোও কবিতা হতে পারে। একটি ড্রিবল হয়ে উঠতে পারে শিল্প। একটি পাস হয়ে উঠতে পারে বিস্ময়। আর একটি বাঁ পা হয়ে উঠতে পারে কোটি মানুষের ভালোবাসার ভাষা। একদিন তার বুট জোড়া তুলে রাখা হবে। মাঠের আলো নিভে যাবে। তারপরেও মেসি থাকবেন। কোটি কোটি সমর্থকদের মাঝে তার সৃষ্টি দিয়েই থাকবেন।