বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিক্রিয়ায় জনগণের আস্থা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঙ্গলবার সকালে তারেক রহমান শেরেবাংলা নগরে সমাধিস্থলে যান এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। ফাতেহা পাঠ করে প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রয়াত চেয়ারপারসনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাতে অংশ নেন তারা। ওদিকে, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সারা দেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। অন্যদিকে, বিএনপি এমন সময়ে তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে যখন দুই দশক পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে দলটি। আর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে আছেন তারেক রহমান।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ও ইসমাইল জবিহউল্লাহ প্রমুখ। এ ছাড়া, উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, আবদুস সালাম আজাদ, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, মহানগর উত্তরের সভাপতি আমিনুল হক, কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা শাহ মো. নেসারুল হক, আশরাফ উদ্দিন খান উজ্জ্বল, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, আবদুস সাত্তার পাটোয়ারি, সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম, হাবিবুর রশীদ হাবিব, এসএম জাহাঙ্গীর, যুবদলের এম মোনায়েম মুন্না, নুরুল ইসলাম, মহিলা দলের সুলতানা আহমেদ, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, ওলামা দলের মাওলানা কাজী মো. সেলিম রেজা, মাওলানা কাজী মো. আবুল হোসেন, জাসাসের জাকির হোসেন জাকির, ছাত্রদলের রাকিবুল ইসলাম রাকিব, নাছির উদ্দীন নাছির প্রমুখ।
দলের চেয়ারম্যানের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা বেষ্টনী তুলে নেয়ার পর দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের ঢল নামে। নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে ‘শুভ শুভ শুভ দিন, বিএনপি’র জন্মদিন’। ‘এক জিয়া লোকান্তরে লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’- প্রভৃতি স্লোগানে মুখর ছিল শেরেবাংলা নগর সমাধি প্রাঙ্গণ।
ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তর-দক্ষিণ, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, কৃষক দল, মহিলা দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব, এগ্রিকালচারিস্ট এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ-এ্যাব, ছাত্রদল, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীরা প্রয়াত নেতার কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায়। এর আগে, গতকাল ভোরে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়।
বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে পাঁচদিনের কর্মসূচি পালন করছে। সারা দেশে বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ ছাড়া রয়েছে রাজধানীতে কেন্দ্রীয় আলোচনা সভা আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তারেক রহমান ও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পৃথক পৃথক বিবৃতিতে দলের নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। ১৯৭৮ সালেল ১লা সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠিত হয় যার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন জিয়াউর রহমান।
জিয়া উদ্যানে বৃক্ষরোপণ-ক্রিসেন্ট লেকে মৎস্য অবমুক্তকরণ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে বৃক্ষরোপণ এবং ক্রিসেন্ট লেকে মৎস্য অবমুক্তকরণ করেছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল সকাল সোয়া ৯টায় শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পরই প্রধানমন্ত্রী জিয়া উদ্যোনে প্রথমে বৃক্ষরোপণ করেন এবং পরে ক্রিসেন্ট লেকে মৎস্য অবমুক্ত করেন। এ সময় ছিলেন- দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু প্রমুখ নেতারা।
বিএনপি’র সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনগণের আস্থা ধরে রাখা
বিএনপি’র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ ও আন্দোলন-সংগ্রামের পর জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এখন দল ও সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণের আস্থা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা। এজন্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জনগণের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। রাজনৈতিক আপডেট ও খবর পর্যালোচনা করা। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলাস্থ জিয়া উদ্যানে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব কথা বলেন। রুহুল কবির রিজভী বলেন, ৪৮ বছর আগে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে কয়েকটি প্রত্যয়কে সামনে রেখে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন, উৎপাদন ও আত্মনির্ভরশীলতার লক্ষ্যে তিনি বৈপ্লবিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি বলেন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বৈদেশিক নীতি, অভ্যন্তরীণ নীতি ও আইনশৃঙ্খলা- সব ক্ষেত্রেই শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি গৌরবজনক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পান। রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আজ যারা সংবাদপত্রে দায়িত্ব পালন করছেন এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করছেন, এর পেছনে শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বিএনপিকে ‘ওয়াদা রক্ষাকারী দল’ উল্লেখ করে রিজভী বলেন, নানা নিপীড়ন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চক্রান্তের মাধ্যমে বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে প্রতিহত করার চেষ্টা হলেও সব বাধা অতিক্রম করে তিনি জনগণ ও গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করেছেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি নিজে অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি থেকেছেন। যথাযথ চিকিৎসা ও বন্দির প্রাপ্য মানবাধিকার থেকেও তিনি বঞ্চিত হয়েছেন; তবুও কোনো আপস করেননি। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ছিলেন মূল প্রেরণা।
বর্তমান সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় এসে জনগণের কাছে দেয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তারেক রহমান নিরলসভাবে কাজ করছেন। সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও উৎপাদনের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।
চ্যালেঞ্জ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ও চক্রান্ত থাকতে পারে। তবে সেগুলো মোকাবিলা করেই তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতাসহ জনগণের কাছে দেয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়ে রিজভী বলেন, এটি শুধু বিএনপি বা সরকারের সংকট নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং জ্বালানিবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তিনি জানান, সরকার সংকট মোকাবিলায় বসে নেই। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দের বাইরে আরও প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মহেশখালীর একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামত করা হয়েছে এবং পুনরায় গ্যাস রিগ্যাসিফিকেশন শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
