‘ধন্যবাদ, লিও’

‘ধন্যবাদ, লিও’

ফন্ট সাইজ:

ফুটবলকে অনেকেই শুধু একটা খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তবে এই খেলাটিই মাঝে মধ্যে একেকটা যুগের সমার্থক হয়ে ওঠে। এই প্রজন্মটা ভীষণ ভাগ্যবান। কারণ এরা এমন এক যুগের সাক্ষী, যা ফুটবলের ইতিহাসে আর কখনো ফিরবে কি না- কেউ জানে না। এই যুগের একপাশে ছিলেন একদলের শৈশব-কৈশোরের পরম নায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, অন্যপাশে ছিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি। আন্তর্জাতিক জার্সিকে বিদায় জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। তাতে রোনালদো ভক্তদের কি কিছু আসা-যাওয়ার কথা? মেসি ভক্তদের মতো রোনালদো ভক্তরাও কি আবেগে ভাসছেন?

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রোনালদো ভক্তরা মেসির প্রতিটি গোলের জবাবে রোনালদোর গোল গুনেছে। এল ক্লাসিকোর রাতে স্পেনের সবুজ গালিচায় যখন সাদা আর বার্সেলোনার নীল-লাল জার্সি মুখোমুখি হতো, তখন মনে হতো যেন দুই গ্রহের সেরা দুই যোদ্ধা বিশ্ব জয়ের লড়াইয়ে নেমেছেন। বার্সার হয়ে মেসি যখন অসাধারণ কোনো ড্রিবলিংয়ে ডিফেন্স ভেঙে দিতেন, মনের অজান্তেই হয়তো রোনালদো ভক্তদের বুকের ভেতর এক ধরনের ভীতি কাজ করতো- ‘আজ বোধ হয় মেসি সব আলো কেড়ে নেবে!’ তবে সেই ভয়টুকুই পরমুহূর্তে রিয়াল মাদ্রিদের ৭ নম্বর জার্সিধারীকে নতুন করে প্রমাণের তাগিদ দিতো। আজ পেশাদার ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে মেসি আর রোনালদো- দু’জনই দু’টি ভিন্ন মহাদেশে নিজেদের মতো করে ফুটবলের রূপকথা লিখে চলেছেন, তখন পেছন ফিরে তাকালে কোনো বিদ্বেষ খুঁজে পাওয়ার কথা নয়। রোনালদো ভক্তরা হয়তো একমতই হবেন- ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আজকের ‘সিআরসেভেন’ হয়ে উঠতেন না, যদি না অন্য প্রান্তে লিওনেল মেসি নামের ওই জাদুকর থাকতেন।

রোনালদো সব সময়ই বলতেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা মাঠের ভেতরেই সীমাবদ্ধ, এর বাইরে নয়। আমরা ১৫ বছর ধরে একই মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছি।’ মেসির মুখ থেকেও একই প্রতিধ্বনি এসেছে অতি সম্প্রতি- ‘ও আমার মতোই মহান। স্পোর্টিং প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা ছিল অসম্ভব সুন্দর। আমরা একে অপরকে এবং নিজেদের ক্লাবকে জেতানোর জন্য সবটুকু দিয়ে লড়েছি।’

সত্যিই তো। রোনালদো যদি ১০০% দিতেন, মেসিকে ছাড়িয়ে যেতে তাকে দিতে হতো ১২০%। আবার মেসির সেই অতিমানবীয় নৈপুণ্য রোনালদোকে ঠেলে দিতো নতুন কোনো উচ্চতায়, চড়ে বসতেন নিজেও। একে অপরকে প্রতিদিন আরও ভালো ফুটবলার বানানোর এই লড়াইটা ছিল ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর যৌথ মহাকাব্য। চোখ বুজলে এখনো ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালের সকালের দৃশ্য দেখতে পাওয়ার কথা। পেনাল্টি মিসের পর হতাশায় ডুবে মেসি যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দিলেন, বিশ্ব ফুটবল তখন হতবাক। কিন্তু সেদিন রোনালদোই শত বৈরিতার ঊর্ধ্বে উঠে বলেছিলেন, ‘মেসির এই কঠিন সিদ্ধান্তটা সবার বোঝা উচিত। ও হেরে যাওয়া বা দ্বিতীয় হওয়ার জন্য অভ্যস্ত নয়। একটা পেনাল্টি মিস কাউকে খারাপ ফুটবলার বানিয়ে দেয় না। মেসিকে কাঁদতে দেখে আমার কষ্ট হয়, আমি চাই ও আবার জাতীয় দলে ফিরুক।’

রোনালদোর সেই সহানুভূতি আর শ্রদ্ধা সেদিন প্রমাণ করেছিল, শত্রুতাবোধ কেবলই সমর্থকদের উগ্রতার সৃষ্টি। ওদিকে, দুই মহীরুহের মধ্যে সব সময় ছিল গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মান। পরবর্তীতে মেসি যখন ফিরে এসে বিশ্বকাপ জয় করলেন, রোনালদো ভক্তদের সেই অধ্যায়টায় কিছুটা দীর্ঘশ্বাস জমা হলেও মেসির লড়াইকে অনাদর করার সাধ্য কারও ছিল না। ২০১৯ সালের সেই উয়েফা অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে? যেখানে দু’জন পাশাপাশি বসে হেসে গল্প করছিলেন। রোনালদো একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘১৫ বছর ধরে আমরা একই মঞ্চে রাজত্ব করছি। ফুটবলে এমনটা আগে কখনো ঘটেছে বলে মনে হয় না। আমাদের সম্পর্কটা দারুণ। যদিও এখনো একসঙ্গে নৈশভোজ করা হয়নি, আশা করি ভবিষ্যতে হবে।’ রোনালদো নিজেই পরে স্বীকার করেছেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ। আমরা ফুটবলকেই বদলে দিয়েছি। যারা ক্রিস্টিয়ানোকে ভালোবাসে, তাদের মেসিকে ঘৃণা করার কোনো কারণ নেই।’

আজ যখন মেসি নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বইটা উল্টে রাখলেন, তখন হয়তো একজন সিআরসেভেন ভক্তের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় একটা কথাই বলতে ইচ্ছা করবে- ‘ধন্যবাদ, লিওনেল মেসি।’ কেননা, এই মেসি না থাকলে রোনালদোর ইতিহাসকে হয়তো পুনর্লিখন করা হতো না। তিনি না থাকলে হয়তো রোনালদোপ্রেমী ফুটবল ভক্তদের শৈশব ও যৌবন এত রোমাঞ্চকর, এত সুন্দর হতো না। তাই আরেকবার, ধন্যবাদ, লিও।