প্রায় ৫ মাস আগে সতর্ক করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, হিমবাহ গলে যাওয়ায় ভয়াবহ পরিণতি সামনে। এ শতাব্দীর শুরু থেকে বরফ গলার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এর আওতায় পড়ে নেপাল, ভারত, ভুটান, বাংলাদেশ সহ এ অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। কিন্তু ওই সতর্কবার্তা কেউ কানে তোলেনি। এমনকি নেপাল সরকারও এ বিষয়ে কি করেছে তা পরিষ্কার নয় এই মুহূর্তে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা-ও পরিষ্কার নয়। এনডিটিভি’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ৫৪৭ জনের মৃত্যু এবং হাজারের ওপরে মানুষ নিখোঁজ থাকার মাত্র পাঁচ মাস আগেই হিন্দুকুশ-হিমালয় (এইচকেএইচ) অঞ্চলের হিমবাহ গলনের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল দু’টি গবেষণা প্রতিবেদন।
এতে বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলের হিমবাহগুলো ক্রমেই দ্রুত গলছে এবং শতাব্দীর শুরু থেকে বরফ গলার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) মার্চ মাসে প্রকাশিত ওই দুই প্রতিবেদনে জানায়, ১৯৭৫ সাল থেকে হিমবাহগুলোর বরফের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে। সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। প্রতিবেদন দু’টি প্রায় ২০০ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। কারণ এ অঞ্চলের হিমবাহ থেকে গলে যাওয়া পানি এশিয়ার ‘পানির টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত পর্বতমালার নিচের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের পানি, খাদ্য, জ্বালানি ও জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস।
নেপালে যে আকস্মিক বন্যায় ৫৩৮ জনের নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তদন্ত করছেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে এক্ষেত্রে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৪ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় যেখানে আগে তুষারপাত হওয়ার কথা, সেখানে বৃষ্টি হচ্ছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে এমনটা হতে পারে। যে উচ্চতায় একসময় তুষারপাত হতো, সেখানে বৃষ্টিপাত এবং দ্রুত হিমবাহ সরে যাওয়ার পেছনে উষ্ণায়নের ভূমিকা থাকতে পারে।
আইসিআইএমওডি’র মার্চের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফের মজুত ৯ শতাংশ কমেছে।
আইসিআইএমওডি’র ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’- প্রতিবেদনে ৩৮টি পর্যবেক্ষণাধীন হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ২০০০ সালের পর হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি এমন একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত যে হিমালয়ের কিছু অংশের হিমবাহ অপরিবর্তনীয়ভাবে পিছিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। তবে গবেষণায় একটি বড় সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ করা ৩৮টি হিমবাহের মাত্র সাতটি বিশ্ব হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থা (ডব্লিউজিএমএস)-এর নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান পূরণ করে। অর্থাৎ, কারাকোরাম, সিকিম, জান্সকার ও ভুটানের মতো বিশাল হিমবাহসমৃদ্ধ অনেক অঞ্চল এখনও পর্যাপ্তভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আসেনি।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার কারণ খুঁজতে আইসিআইএমওডি’র গবেষকরা এখন একটি সম্ভাব্য বরফশিলা ধসের বিষয় তদন্ত করছেন। গবেষকদের ধারণা, উচ্চ পার্বত্য কোনো এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলাখণ্ড ধসে পড়ে লেন্দে খোলা নামের একটি জলধারায় গিয়ে পড়তে পারে। লেন্দে খোলা ভোতে কোশি নদীর একটি উপনদী। এর ফলে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি ও বিশাল শিলাখণ্ডের স্রোত তৈরি হয়ে নিচের দিকে ধেয়ে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। আইসিআইএমওডি’র জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ এবং ভারতের ইন্দোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
তার ব্যাখ্যা, তুষারের আচ্ছাদন কমে যাচ্ছে, হিমবাহ পিছিয়ে যাচ্ছে এবং আরও বেশি পাথুরে ও অনাবৃত ভূমি উন্মুক্ত হচ্ছে। এসব ভূমি বেশি তাপ শোষণ করে, ফলে পাহাড়ের ঢাল আরও অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ক্রমেই মনে হচ্ছে, হিমবাহ সরে যাওয়ার কারণে তুষারের আচ্ছাদন কমে যাওয়া এবং পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটির বরফ গলে যাওয়ার বিষয়টি এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের মজুত রয়েছে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে। আইসিআইএমওডি’র হিসাবে, এখানে ৬৩ হাজার ৭০০-এর বেশি হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এসব হিমবাহ এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার পানির উৎস। কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকা এই নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আইসিআইএমওডি’র মার্চের দুই প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহগুলোর অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতাভিত্তিক উষ্ণায়নের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হিমবাহ গলার মাত্রা গোটা অঞ্চলে সমান নয়। পূর্ব হেংদুয়ান শান পর্বতমালায় গত তিন দশকে হিমবাহের আয়তন কমেছে সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো এলাকায় মাত্র ৩০ বছরের মধ্যেই হিমবাহের আয়তন ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে মোট আয়তনের হিসাবে সবচেয়ে বেশি হিমবাহ হারিয়েছে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। এই অঞ্চলে হিন্দুকুশ-হিমালয়ের মোট হিমবাহের ৭৪ শতাংশেরও বেশি অবস্থিত। ফলে বিজ্ঞানীদের কাছে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং এটি দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
