নেপালে আহাজারি। হাহাকার। আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে। চারদিক বেদনাবিধূর। ক্রমশ বাড়ছে লাশের সংখ্যা। সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে- নেপাল ও তিব্বতে প্রলয়ংকরী বন্যায় নিখোঁজের সংখ্যা দেড় হাজার প্রায়। তবে সঠিক সংখ্যা পাওয়া দুষ্কর। চোখের পলকে প্রিয়জন হারিয়ে বাকরুদ্ধ মানুষ। বাড়িঘর, সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব অসংখ্য মানুষ। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শুধু নেপালে নিহতের সংখ্যা ৫৪৭। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবারের দুর্যোগে তিব্বতেও অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে নেপাল ও চীনে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৫৫২ জনে। দুই দেশ মিলিয়ে ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই বন্যা কবলিত এলাকায় নতুন করে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এতে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে সেখানে আন্তর্জাতিক ত্রাণ তৎপরতা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, বন্যায় নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৫৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
চিলিমে এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত কমল খারেল বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন, বুধবার সকালে হিমবাহ ধসের পর পুরো জায়গাটা এমনভাবে কাঁপছিল যেন বিশাল কোনো ভূমিকম্প হচ্ছে। কিন্তু যখন আমি বাইরে গেলাম, দেখলাম চারদিকে কেবল ঝড় আর প্রমত্ত জলরাশি। আমি এর আগে এত উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখিনি। এমন ঢেউ কেবল সমুদ্রেই দেখা যায়। অন্যদিকে, নুয়াকোটের সোলে গ্রামের সাংবাদিক নিরাজন পৌড়েল তার বাবা-মা ও স্বজনদের খোঁজে সেখানে ছুটে গেছেন। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত কোনো খবর পাইনি। আমার ভয় হচ্ছে, হয়তো আর কোনো খবর পাবো না।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যা দুর্গত এলাকায় একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। যেকোনো সময় এটি ভেঙে নতুন বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে। চীনের কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, সোগিয়াল ও পুরুপকিয়াংজাংবু নদীর মোহনায় সৃষ্ট একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার এই বন্যাকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে জানান, জরুরি চিকিৎসাসেবা, আশ্রয় ও পানির জন্য প্রাথমিকভাবে ২০ লাখ ডলারের তহবিল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা সৃজনা গুরুং বলেন, নেপাল একের পর এক জলবায়ু ধাক্কার সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি বলেন, নেপালে বন্যা এবং ভূমিধস সবসময়ই ঘটে, কিন্তু জলবায়ু সংকট এগুলোকে আরও বেশি ঘন ঘন এবং তীব্র করে তুলছে। এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হতে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছানো। বিশুদ্ধ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মায়া ওয়াং চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, এই বন্যা প্রশ্ন তুলেছে যে, চীনা কর্তৃপক্ষ দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে আরও কিছু করতে পারত কিনা। তিনি বেইজিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিব্বতিদের তথ্যের অধিকার দেয়া হোক এবং আন্তর্জাতিক গবেষক ও সাংবাদিকদের ওই অঞ্চলে অবাধ প্রবেশের সুযোগ দিয়ে এই বিপর্যয়ের একটি কঠোর তদন্ত করা হোক।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবারের দুর্যোগে তিব্বতেও অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে নেপাল ও চীনে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৫৫২ জনে। দুই দেশ মিলিয়ে ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ওদিকে দুর্যোগের তৃতীয় দিনেও ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলে শুক্রবার। নিখোঁজদের সন্ধানে ১৪ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৭৪২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ বরফ ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হওয়ার পর এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। তিব্বতের অংশে একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর শুক্রবার নেপাল পুলিশ নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে। নিরাপত্তাকর্মী, উদ্ধারকারী ও ত্রাণকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। তিব্বতে ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি একটি হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করলে চীন সাময়িকভাবে উদ্ধার অভিযান বন্ধ করে দেয়। পরে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, পরিস্থিতির ঝুঁকি কমে আসায় আবার উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে। তবে ওই হ্রদটি নেপালের সতর্ক করা সেই ধ্বংসাবশেষের বাঁধ কি না, যেটি ইতিমধ্যে ভেঙে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন কর্মকর্তারা।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, বন্যায় বিধ্বস্ত এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার আরও ২১ জন ভারতীয় কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন। তিনি বলেন, এর আগে ত্রিশুলি ওয়ান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৬৩ জন ভারতীয়কেও উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চীনের অংশে আটকে থাকা আরও ৯৬ জন ভারতীয় নাগরিক নিরাপদে স্থলপথে নেপালে প্রবেশ করেছেন। তবে প্রায় ৩২০ জন ভারতীয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত ১০০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন জয়সওয়াল। ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ভয়াবহ দুর্যোগে নিখোঁজদের উদ্ধারে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও বন্যাকবলিত এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
