সপরিবারে নিহত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি এখন সুনশান-নীরব। রহস্যে ঘেরা হত্যা ঘটনায় বাড়িটি এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। শুক্রবার সরজমিন দেখা যায়, আনোয়ার, নুর ইসলাম, মারুফ, হুমায়ুন ফরিদ ও নাজমুলসহ পাঁচ পুলিশ বাড়িটি পাহারায় রয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন এ বাড়িটি একনজর দেখার জন্য ভিড় করছে।
দুপুরে নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশীদ ক্রাইম সিন পরিদর্শনে আসেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই। তদন্ত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সহায়তা নেয়া হচ্ছে। চার খুনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিকালে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্য হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে। কর্মসূচিতে অংশ নেয়, রংপুর সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট, সনাতনী অধিকার আন্দোলন, ব্রাহ্মণ সংসদ রংপুর জেলা ও মহানগর, হিন্দু যুব জোট ও মহাজোটের নেতৃবৃন্দ। এতে বক্তব্য রাখেন মানিক চৌধুরী জয়, প্রদীপ কান্তি, ফিজুর দাসসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দাসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। সেই সঙ্গে এ হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সুষ্ঠুভাবে মামলার তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে।
বক্তারা বলেন, যে দু’টি ছেলেকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের দেখে বিশ্বাস হয় না, তারা চারজনকে হত্যা করেছে। এদের সঙ্গে রাঘব-বোয়ালরা জড়িত থাকতে পারে। তদন্তকারীদের সূক্ষ্মভাবে তদন্ত করে সেই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
তবে চাঞ্চল্যকর এই চার হত্যা মামলার ঘটনাকে ঘিরে রহস্যের জট যেন খুলছে না। পুলিশ এ মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করলেও মানছে না রংপুরবাসী। একের পর এক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। এ নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। বেকায়দায় রয়েছে পুলিশ-প্রশাসন। মানুষদের মনে প্রশ্ন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দু’জন যুবক কী করে চারজনকে হত্যা করলো। এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। কেউ কি ধস্তাধস্তি কিংবা চিৎকারের শব্দ শুনতে পায়নি? গণপতি চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর মোবাইলের কললিস্ট ধরে কি পুলিশ কোনো ক্লু পায় নি! নতুন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাংবাদিক তৌফিক মারুফের বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে। বক্তব্যে তিনি পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যা ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। সেই সঙ্গে আগামী চক্রবর্তীর এক বান্ধবীর জমি সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথোপকথন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এ ঘটনায় মুখ খুলছে না মাছুয়াপাড়ার মানুষজন। সকলের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। জানা যায়, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া এলাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। এ পাড়ার চারপাশে রয়েছে অসংখ্য মন্দির। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনেই রয়েছে মন্দির। শিক্ষক গণপতি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হোমিও চিকিৎসালয় কেন্দ্র খুলেছিলেন। তদন্তকালে জানা যায়, গণপতি চক্রবর্তীরা তিন ভাই। এক ভাই আগেই পরলোকগমন করেছেন। তার একটি মাত্র কন্যা রয়েছে। অপর এক ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী মিঠাপুকুর উপজেলার ১৬ নং ইউনিয়ন বয়রাতিতে বসবাস করেন। তার ভাই নীরব পাথর হয়ে আছে। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চোখের পানি ঝরাচ্ছেন। একমাত্র বড় বোন কুড়িগ্রামে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। সকলের মধ্যে ছিল আন্তরিকতা ও সু-সম্পর্ক।
শিক্ষকতা করাকালীন গণপতি নগরীর মাছুয়াপাড়ায় প্রায় ৬ শতক জমি ক্রয় করে নির্মাণ করেন তিন তলা ভবন। সেখানে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা আগামী চক্রবর্তী ও পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া পুত্র প্রিয়ম চক্রবর্তীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করছিলেন। বাড়িটির ডানে রয়েছে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাড়ি এবং বাঁয়ে রয়েছে প্রতিবেশী দেবু’র বাড়ি। কারমাইকেল কলেজপড়ুয়া গণপতির কন্যা আগামী চক্রবর্তীর প্রেমিক অদিত করের সঙ্গে বিয়ের প্রাথমিক আলোচনা চলছিল। এলাকাবাসী জানান, শিক্ষক গণপতির সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। আকস্মিক সপরিবারে হত্যার ঘটনা সকলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২২শে আগস্ট আত্মীয়-স্বজন চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পুলিশে জানায়।
এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ গণপতির বাড়ি এসে প্রথম তলার দ্বিতীয় সিঁড়িতে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫), দ্বিতীয় তলায় খাটের নিচে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২) এবং চিলেকোঠায় গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) লাশ উদ্ধার করে। এ সময় বাড়ির আসবাবপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকাসহ আলমারির ড্রয়ার ভাঙা অবস্থায় ছিল। পুলিশ প্রথমত এটিকে ডাকাতির ঘটনা মনে করলেও পরবর্তী ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জবানবন্দি থেকে জানতে পারে মাদকসেবনে বাধা দেয়ার কারণে তারা চক্রবর্তী পরিবারের সকলকে হত্যা করেছে। হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তি, আলামতসহ স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর থেকে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিয়ে অভিযুক্ত দুই আসামিকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে চক্রবর্তী পরিবারকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগটি প্রমাণিত হয়।
ময়নাতদন্তকালে প্রীতিলতা ও আগামীর দেহ থেকে বীর্য পাওয়ার দাবি তোলেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশ কাটা ডোম জয়তুন। তার সঙ্গে কথোপকথনের গোপন ভিডিও একটি বেসরকারি গণমাধ্যমে প্রচার হলে তোলপাড় শুরু হয়। সেখানে তিনি বলেন, আমি অনেকদিন ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ কাটি। ময়নাতদন্তের জন্য এখানে চারটি লাশ আনা হলে আমি লাশগুলো কাটি। ডাক্তার আমাকে বলে দেখো তো কিছু আছে কিনা। আমি দেখি মেয়ের ভ্যাজাইনা থেকে বীর্য বেরুচ্ছে। তখন ডাক্তার বলছে রাখি দেও। মেয়ের মায়ের ভ্যাজাইনারও সোয়াব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুইটা ভ্যাজাইনা সোয়াব সিআইডি পুলিশ নিয়ে গেছে, দুইটা মেডিকেলে পরীক্ষা করার জন্য দিছে। মেয়েটার ভ্যাজাইনাতে বীর্য ছিল। এব্যাপারে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ইনচার্জ ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, ধর্ষণের বিষয়ে আমরা কোনো সাইন পাইনি। আমরা যেসব সোয়াব মাইক্রোবায়োলজিতে পাঠিয়েছিলাম সেখানে ধর্ষণের কোনো সাইন পাওয়া যায়নি।
সেই অর্থে আমরা বলতে পারি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। সদ্য বিদায়ী রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল মাবুদ এ বিষয়ে জানান, গলায় কাপড় পেঁচানোর কারণে তাদের ভ্যাজাইনাতে বীর্য এসেছে। ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। হত্যা ঘটনায় আগামী চক্রবর্তীর বান্ধবীর বিষয়ে জানতে প্রেমিক অদিত করের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে তার বড় ভাই সন্দ্বীপ কর বলেন, অদিতের শারীরিক অবস্থা ভালো না। আমরা যা বলার পুলিশকে বলেছি। পূজা উদ্যাপন কমিটির সাবেক সভাপতি ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সেক্রেটারি সুব্রত সরকার মুকুল বলেন, আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ অপরাধীদের শাস্তির দাবি করছি।
