অষ্টম শ্রেণিতে পড়া চট্টগ্রামের এক মাদ্রাসাছাত্র। মামাকে সাহায্য করতে গিয়ে হয়ে গেলেন ‘কাজী’। এক যুগের বেশি সময়ে নিজ হাতে পড়িয়েছেন ছয় হাজারেরও বেশি বিয়ে। সেই ‘কাজী’ এখন মিস্ট্রি স্পিনার। বাংলাদেশ এইচপি দলের হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজে। এই কাজীর নাম মোহাম্মদ রুবেল। ৬ ম্যাচে ২০ উইকেট নিয়ে এ ডানহাতি অফব্রেক বোলার এখন আলোচনার তুঙ্গে। সবশেষ নর্দান টেরিটরির বিপক্ষে ৪ ওভারে ২১ রানে পেয়েছেন ফাইফার। তার বোলিং দাপটে ৯ উইকেটে ১৪৩ রানে থামে তাদের ইনিংস। জবাবে ১৮.২ ওভারে লক্ষ্যে পৌঁছায় বাংলাদেশ এইচপি দল। ছয় ম্যাচের পাঁচটিতে জয় নিয়ে পয়েন্ট তালিকার ১০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। নিজের বোলিং অ্যাকশন, হাতের কবজি বা আঙ্গুলের পজিশন পরিবর্তন না করেই বলকে দুই দিকে ঘোরাতে পারা বোলারদের বলা হয় মিস্ট্রি বা রহস্যময় স্পিনার।
এই ধরনের বোলাররা সাধারণত ক্যারম বল, দুসরা, ফ্লিপার বা ব্যাক-স্পিনের মতো বৈচিত্র্য বা ভ্যারিয়েশন ব্যবহার করে থাকেন। শ্রীলঙ্কার অজান্তা মেন্ডিস, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুনিল নারিন, ভারতের বরুণ চক্রবর্তী, পাকিস্তানের সাইদ আজমলরা মিস্ট্রি স্পিনার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাপট দেখিয়েছেন। তবে দেশের ক্রিকেটে এমন স্পিনার হাতে গোনা। আলিস ইসলাম আলোচনায় থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি। চোটের কারণে অনেকদিন ধরে আলোচনার বাইরে তিনি। আলিস না থাকলেও নতুন করে আলোচনায় রুবেল। ২০১১ সালে টেপ টেনিস দিয়ে চট্টগ্রামে ক্রিকেট শুরু তার। ঢাকায় পা রাখেন ২০১৬ সালে। শুরুর দিকে ছিলেন সাদামাটা এক অফস্পিনার। বছরের পর বছর দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে বল করে নজরে আসতে পারেননি। জাতীয় দলের নেটে বোলিং করার সময় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের একটি ছোট্ট পরামর্শ বদলে দেয় তার ক্যারিয়ারের গতিপথ। ফলো-থ্রু একটু সামনে আনার সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে কোনো কোচ ছাড়াই, নিজের চেষ্টায় বোলিংকে নতুন করে গড়ে তোলেন রুবেল। পরিশ্রমের ফল মিলতে শুরু করে ধীরে ধীরে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগে ৩৭ উইকেট, পরের মৌসুমে প্রথম বিভাগে ৪৩ উইকেট নিয়ে নজর কাড়েন তিনি।
এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে ১০ উইকেট নিয়ে জেতেন ‘মোস্ট প্রমিজিং ক্রিকেটার’-এর খেতাবও। তবু বিপিএলের ড্রাফটে প্রথমে জায়গা হয়নি তার। পরে ড্রাফটে যুক্ত হন রুবেল। আর নিলামে ১১ লাখ টাকায় তাকে দলে ভেড়ায় রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। সাদামাটা অ্যাকশনের আড়ালেই রুবেলের বোলিংয়ের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে। তুলনামূলক কম উচ্চতার কারণে নিচু রিলিজ পয়েন্ট থেকে দ্রুত ও ফ্ল্যাট ট্রাজেক্টরিতে ব্যাটারদের কাছে তার বল আসে। এ সুবিধা ব্যাটারদের লেন্থ বিভ্রান্ত করে দেয়। এর সঙ্গে দুসরা, আর্ম বল ও ক্যারম বলের কারিশমা তো রয়েছে। একসময় দুসরায় হাত বেঁকে যাওয়ার সমস্যা ধরা পড়েছিল তার। সেই ডেলিভারি করতে নিষেধও করা হয়। কঠোর পরিশ্রমে অ্যাকশন শুধরে নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকেই আবার দুসরা করার সামর্থ্য অর্জন করেন তিনি। এখন অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে চলমান টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স দলের হয়ে যেন আগুন ঝরাচ্ছেন রুবেল। ৩০ বছর বয়সী এই স্পিনার নেপালের বিপক্ষে চার, হোবার্ট হারিকেন্সের বিপক্ষে তিন, ভিক্টোরিয়া ক্রিকেটার্স ইলেভেনের বিপক্ষে চার উইকেট এবং নর্নান টেরিটরির বিপক্ষে নিলেন পাঁচ উইকেট। ধারাবাহিক বোলিং পারফরম্যান্সে রুবেল টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ইকোনোমি পাঁচের কম। চট্টগ্রামে থাকলে এখনো নিয়মিত বিয়ে পড়ান রুবেল। তবে ঢাকায় খেলতে এলে বন্ধ থাকে সেই কাজ। কাজী পেশার সাফল্য ছাপিয়ে এবার জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন তিনি।
