ইউরোপিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রাতগুলোর অপেক্ষা এবার শেষ। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২০২৬-২৭ মৌসুমের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের ‘লীগ ফেজ’ বা গ্রুপ পর্বের ড্র। ইউরোপের সেরা ৩৬টি দলের এই লড়াইয়ের সূচি নির্ধারণের পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে কথার লড়াই ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। মাদ্রিদের রিয়াদ এয়ার মেট্রোপলিটানো স্টেডিয়ামে আগামী বছরের ৫ই জুন হতে যাওয়া ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি দলকেই পাড়ি দিতে হবে দুর্গম পথ।
এবারের ড্রয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি)। টানা দু’বারের ইউরোপসেরা ফরাসি জায়ান্টদের সামনে এবার বড় পরীক্ষা। লীগ পর্বে পিএসজি মুখোমুখি হবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের দুই শক্তিশালী দল ম্যানচেস্টার সিটি এবং অ্যাস্টন ভিলার। এমনকি পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনার বিপক্ষেও লড়তে হবে লুইস এনরিকের শিষ্যদের। ইত্তিহাদ স্টেডিয়াম বা ভিলা পার্কে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের আতিথেয়তা নেয়া সহজ হবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে, রিয়াল মাদ্রিদ তাদের চারটি হোম ম্যাচের তিনটি লড়বে চ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে; সিরি আ চ্যাম্পিয়ন ইন্টার মিলান, ডাচ্ লীগের শিরোপাধারী পিএসভি ও অস্ট্রিয়ার চ্যাম্পিয়ন এলএএসকে’র বিপক্ষে। ঘরের মাঠে অল হোয়াইটদের আরেক প্রতিপক্ষ লাইপজিগ। অল হোয়াইটদের চার অ্যাওয়ে ম্যাচের প্রতিপক্ষ প্রিমিয়ার লীগ জয়ী আর্সেনাল, ইউক্রেইনের প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন শাখতার দোনেৎস্ক, গ্রিক লীগের চ্যাম্পিয়ন এইকে এথেন্স ও সিরি আর ক্লাব রোমা। ইংলিশ ক্লাবগুলোর জন্য এবারের ড্র মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। গতবারের রানার্সআপ ও প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন আর্সেনাল পড়েছে বেশ হাই-ভোল্টেজ সব প্রতিপক্ষের মুখে। মিকেল আর্তেতার দল ঘরের মাঠে খেলবে রেকর্ড ১৫ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে। অ্যাওয়ে ম্যাচে তাদের লড়তে হবে বায়ার্ন মিউনিখের মাঠে।
গত ফাইনালে পিএসজি’র কাছে পেনাল্টিতে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হওয়া গানাররা এবার শুরু থেকেই কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়ছে। এদিকে, পেপ গার্দিওলার উত্তরসূরি এনজো মারেস্কার ম্যানচেস্টার সিটি ঘরের মাঠে পিএসজিকে স্বাগত জানাবে। তবে তাদের বার্সেলোনার বিপক্ষে ন্যু ক্যাম্পে গিয়ে খেলতে হবে। এই ম্যাচে সিটির সাবেক তারকা রদ্রির মুখোমুখি হওয়াটা হবে দারুণ এক দৃশ্য। অন্যদিকে ইউরোপা লীগ জয়ী অ্যাস্টন ভিলা উনাই এমেরির হাত ধরে দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিযোগিতায় ফিরে পেয়েছে পিএসজি ও বার্সেলোনার মতো কঠিন প্রতিপক্ষকে।
দুই বছর পর চ্যাম্পিয়নস লীগে ফেরা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও স্বস্তিতে নেই। মাইকেল ক্যারিকের দল বায়ার্ন মিউনিখ, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এবং রোমার মতো ঐতিহ্যবাহী দলের বিপক্ষে নামবে মাঠে। লিভারপুলের ভাগ্যে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তুলনামূলক সহজ গ্রুপ পেলেও অল রেডদের খেলতে হবে ইন্টার মিলান এবং অ্যাটলেটিকোর মতো চেনা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর বাইরে এবারের ড্রয়ের অন্যতম বড় আকর্ষণ চার নতুন দল- ইতালির কোমো, যাদের কোচ কিংবদন্তি স্প্যানিশ সেস্ক ফ্যাব্রেগাস, অস্ট্রিয়ার লাস্ক, নরওয়ের ভাইকিং এবং আজারবাইজানের উদীয়মান ক্লাব সাবাহ এফকে। ফুটবল বিশ্বের নজর থাকবে এই নবাগতদের চমক জাগানিয়া পারফরম্যান্সের দিকে। বিশেষ করে, সাবাহ এফকে তাদের প্রথমবারই লড়বে বার্সা, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও আর্সেনালের মতো জায়ান্টদের বিপক্ষে।
নতুন এই লীগ ফেজে প্রতিটি দল আটটি করে ম্যাচ খেলবে, যার চারটি ঘরের মাঠে এবং চারটি প্রতিপক্ষের মাঠে। পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ আট দল সরাসরি জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে। আর নবম থেকে চব্বিশতম স্থানে থাকা দলগুলো খেলবে দুই লেগের নকআউট প্লে-অফ। আগামী ৮ই সেপ্টেম্বর মাঠে গড়াচ্ছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের এই মহাযুদ্ধ। ২৭শে জানুয়ারি শেষ হবে লীগ পর্বের লড়াই। শনিবার প্রকাশ হতে যাওয়া পূর্ণাঙ্গ সূচিতে জানা যাবে কোন দিন কোন হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মাঠে নামছে।
‘নতুন সম্মাননা’ মার্কুইনহোসের
উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন চ্যাম্পিয়নস লীগের ড্রয়ের মঞ্চে গোল বা ট্রফির বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক পুরস্কারের ঘোষণা দেন। মানুষের মহত্ত্ব ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতাকে সম্মান জানাতে চালু করা হয়েছে ‘অফ-ফিল্ড রেসপেক্ট অ্যাওয়ার্ড’। এই ঐতিহাসিক পুরস্কারের প্রথম বিজয়ী হয়েছেন পিএসজি অধিনায়ক মার্কুইনহোস।
ব্রাজিলিয়ান তারকা ডিফেন্ডারের হয়ে ট্রফি গ্রহণ করেন পিএসজি সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি। গত মৌসুমের ফাইনাল জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে ভেঙে পড়া আর্সেনাল খেলোয়াড়দের মার্কুইনহোস যেভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, তারই স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই সম্মান দেয়া হলো। ১৯৯৮ থেকে খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড দিয়ে আসছে উয়েফা। সেটি এবার উঠেছে উঠল এবার ফ্রান্সের কিংবদন্তি ও বিশ্লেষক থিয়েরি অঁরির হাতে।
