একসময় রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় ও সুরক্ষার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ৯ বছর পর দেশটিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে তীব্র বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি তাদের শিশুদের জন্য পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোও এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তারা একই ধর্মের মানুষ বলেই শুধু নয়, মানুষ হিসেবে তাদের জীবন মূল্যবান। তাই তাদের রক্ষা করতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। উত্তর মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা ইরহান (পরিবর্তিত নাম) বলছেন, স্কুলে যাওয়াটাই এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ার সরকারি স্কুলে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ার সুযোগ নেই। ফলে তারা সাধারণত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের পরিচালিত অনিবন্ধিত ‘লার্নিং সেন্টার’-এ পড়াশোনা করে। সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠান পুলিশের অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
গত মাসে ইরহানের স্কুলে আটজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ কর্মকর্তা অভিযান চালান। তারা শিক্ষার্থীদের ছবি তোলেন এবং কয়েকজনকে বাড়ি ফিরে যেতে নির্দেশ দেন। ইরহান বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনা করতে এখানে আসে। এখন তাদের পরিবারগুলোও ভয় পাচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় সেলাঙ্গরের একটি রোহিঙ্গা স্কুলও নিরাপত্তার কারণে এক মাস ক্লাস বন্ধ রেখেছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে স্কুলটি পুনরায় খুললেও শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম না পরে আসা, ক্লাস শেষে সরাসরি বাড়ি চলে যাওয়া এবং দলবদ্ধ হয়ে কোথাও অবস্থান না করার নির্দেশ দেয়া হয়। রোহিঙ্গা শিক্ষক ফারুক বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ঠেকাতে নিজেদের আড়ালে রাখছি। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান সব জায়গায় একই রকম নয়; অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনমত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনাই এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের কারণে গত কয়েক মাসে কয়েকটি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশের কিছু এলাকায় বছরের পর বছর বসবাস করা গ্রাম থেকেও রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। পেনাংয়ের কাছে একটি মাছ ধরার গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী রাজধানী কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কার্যালয়ের বাইরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাদের সাময়িকভাবে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের অর্ধেকেরও বেশি ছিল শিশু। দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অনিশ্চিত অবস্থায় থাকা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাবে, মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পুনর্বাসিত হয়েছে। বাংলাদেশের পর এটিই রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম আশ্রয়স্থল। তবে অধিকারকর্মীদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। মুসলিম রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাখাইন রাজ্যে তাদের বসবাসের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরনো হলেও মিয়ানমারের একের পর এক সরকার তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে দাবি করেছে। স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জাতিগত উত্তেজনা বারবার সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কেউ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে, আবার অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়েছে।
রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মালয়েশিয়ায় তাদের প্রতি সহনশীলতাও কমেছে। মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়প্রার্থীদের স্বীকৃতি দেয় না। ফলে শরণার্থীদের আবাসন, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার আইনি অধিকার নেই। তবু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা নিরাপদ আশ্রয় ও অর্থনৈতিক সুযোগের জায়গা হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করোনাভাইরাস ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের সঙ্গে চাকরি নিয়ে প্রতিযোগিতার অভিযোগও করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বহিষ্কারের দাবিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।
