ভ্যাটিকানের অস্তিত্বহীন রাষ্ট্রের 'দূতাবাস'

ভ্যাটিকানের অস্তিত্বহীন রাষ্ট্রের 'দূতাবাস'

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র ভ্যাটিকান সিটির রাস্তায় এমন অনেক ঘটনার জন্ম হয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। সম্প্রতি ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারের কাছে সাবেক যুগোস্লাভিয়া বা বর্তমান ক্রোয়েশিয়া থেকে আগত এক গৃহহীন ব্যক্তি এবং তাঁর মায়ের বসবাস আন্তর্জাতিক সমাজতাত্ত্বিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁরা প্রকাশ্যে দাবি করছেন যে, তাঁরা রাস্তায় বসে একটি 'অস্তিত্বহীন' বা প্রস্তাবিত নতুন দেশের 'দূতাবাস' পরিচালনা করছেন। তাদের সাথে আমার কথা হলো । জানতে চাইলাম তাঁরা এখানে কী করছে । আমাকে তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে সাহায্য কামনা করলো। তাঁরা নতুন একটি দেশের কন্সেপ্ট নিয়ে প্রায় আট বছর রয়েছেন।
এই মা ও ছেলের এমন অদ্ভুত দাবির পেছনে রয়েছে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যুগোস্লাভিয়ার রক্তক্ষয়ী ভাঙন এবং বলকান যুদ্ধের ভয়াবহ ট্রমা। যুদ্ধের ফলে নিজ ভূমি ও জাতীয় পরিচয় হারানো লাখ লাখ মানুষের মতো তাঁরাও রাষ্ট্রহীনতার শিকার। মনস্তত্ত্বের ভাষায়, রাস্তায় বসে কাল্পনিক একটি দেশের 'দূতাবাস' খোলার এই দাবিটি মূলত তাঁদের হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের খোঁজ এবং এক ধরনের মানসিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (Coping mechanism)। বাস্তব রাষ্ট্রের সুরক্ষা না পেয়ে তাঁরা নিজেদের মনের ভেতর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কল্পনা করে নিয়েছেন।
তাঁদের এই দাবিটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির 'মাইক্রোনেশন' বা ক্ষুদ্র-রাষ্ট্র তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়। ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যবর্তী অমীমাংসিত ভূখণ্ডে এ ধরনের বেশ কিছু অঘোষিত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রয়েছে, যেমন 'ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্ডিস' (Free Republic of Verdis) বা 'লিবারল্যান্ড'। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও এসব 'রাষ্ট্র' নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রা তৈরি করে এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে 'দূতাবাস' খোলার দাবি করে। ভ্যাটিকানের রাস্তায় বসবাসকারী এই মা-ছেলে সম্ভবত এ ধরনেরই কোনো কাল্পনিক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ইউরোপের এত শহর থাকতে তাঁরা কেন ভ্যাটিকানকে বেছে নিলেন, তার উত্তর লুকিয়ে আছে পোপ ফ্রান্সিসের যুগান্তকারী মানবিক উদ্যোগের মধ্যে। ভ্যাটিকানে গৃহহীনদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসালয়, গোসলের জায়গা, নাপিত এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি শীতের রাতে এক গৃহহীন নারী রাস্তায় সন্তান প্রসব করলে, পোপ তাঁকে ভ্যাটিকানের নিজস্ব বাসস্থানে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এই চরম সহনশীলতা ও নিরাপত্তাবোধই এই ভাসমান মানুষদের ভ্যাটিকানের রাস্তায় নিজেদের 'দূতাবাস' প্রতিষ্ঠার সাহস জুগিয়েছে।
ক্রোয়েশিয়া ও ভ্যাটিকানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক সংযোগও রয়েছে। ১৯৯২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও আগে ভ্যাটিকানই প্রথম ক্রোয়েশিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আজ সেই ভ্যাটিকানের মাটিতে বসেই একজন ক্রোয়েশীয় নাগরিক তাঁর নিজস্ব একটি 'অস্তিত্বহীন রাষ্ট্রের' স্বীকৃতি খুঁজছেন, যা ইতিহাসের এক পরাবাস্তব পুনরাবৃত্তি।
আইনগত দিক থেকে এই মা ও ছেলের দাবি করা 'দূতাবাস'-এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি মূলত 'প্রদর্শনমূলক সার্বভৌমত্ব' বা রাষ্ট্রহীনতার বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। বিশ্বব্যবস্থা যখন তাঁদের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন ভ্যাটিকানের মতো ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রের আশ্রয়ে তাঁরা নিজেদের মতো করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।

(ভ্যাটিকান থেকে)