জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য ও ওয়াকআউটের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা না করার উদ্দেশ্যেই বিরোধী দল পরিকল্পিতভাবে সংসদ ত্যাগ করেছে। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইন নিয়ে প্রথম অধিবেশন থেকেই বিরোধী দল দাবি জানিয়ে আসছিল, অথচ সংশোধিত বিল উত্থাপনের সময়ই তারা ওয়াকআউট করেছে, যা দুঃখজনক।
বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তড়িঘড়ি করে প্রণীত মানবাধিকার কমিশন আইনের নানা ত্রুটি সংশোধনে আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করেছেন। দেশি-বিদেশি স্টেকহোল্ডার, কূটনৈতিক মিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং ইউএনডিপির সঙ্গে একাধিক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্মত ও দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিল প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশন বিল এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’—উভয়টিই সংসদে উত্থাপন করে কমিটিতে পাঠানোর কথা ছিল। বিলের কপি আগেই সংসদ সদস্যদের সরবরাহ করা হয়েছিল এবং কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগও ছিল। কিন্তু এসব বিলকে বাহানা করে বিরোধী দল সংসদ ত্যাগ করেছে।
রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে সংসদ আহ্বানের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা বিরোধীদলীয় নেতার নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও শপথসহ নানা রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার মধ্যেও সরকার দ্রুত সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেছে, অথচ তা নিয়ে অযথা সমালোচনা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট তথ্য দিলে সরকার ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। কিন্তু অস্পষ্ট অভিযোগ তুলে গণমাধ্যম বা জনসভায় বক্তব্য দেওয়া আর সংসদে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য উপস্থাপন করা এক নয়।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিগত ১৬-১৭ বছরের অপরিকল্পিত নীতির ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও দেশে তা সহনীয় রাখতে চেষ্টা চলছে। জরুরি ভিত্তিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু, এফএসআরইউ নির্মাণ এবং এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই জারি করা হয়েছিল এবং অনেকটা মার্শাল ল অর্ডারের মতো ছিল। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নেওয়ার প্রস্তাব ছিল সরকারের পক্ষ থেকেই।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানে কোনো ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর বিধান নেই। সংবিধান মেনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আবার সেটিকেই অস্বীকার করা দ্বিমুখী আচরণ। সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গঠন করা হয়েছে এবং এর কার্যপরিধি সংবিধান সংশোধন করা।
বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকার ও বিরোধী উভয় দলের সংসদ সদস্যদের প্রতি সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত রাখার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদকে গণতান্ত্রিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হবে।
উল্লেখ্য, একই অধিবেশনে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে আরেকটি বিল আনা হয়েছে। এছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্যও একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়।
