মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্রকাশ করলে সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। গতকাল জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে রুমিন ফারহানা জানতে চান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গত ৭ই আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সুবিধা কী হবে, কিংবা বাংলাদেশ এই প্যাক্ট থেকে কী পেতে পারে? জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই প্যাক্ট তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে। আমরা এই প্যাক্টকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।’ ‘এতে বাংলাদেশের যোগদান বা যোগদানের বিষয়টি এখন পর্যন্ত আসেনি। কারণ, এটি নির্ভর করছে প্যাক্টের সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তারা যদি বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই সেটি ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করবো। কিন্তু তার আগে এর ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করার সময় সম্ভবত এখনও আসেনি।’ খলিলুর রহমান বলেন, ‘সরকার বিষয়টির সব দিক বিবেচনায় রাখবে।’ প্যাক্টটি বিস্তৃত হলে এটি বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং, এটি নিয়ে অন্য কারও উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।’
নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা করা হয়েছে: এদিকে বর্তমান সরকারের স্বাবলম্বী ও সুদৃঢ় পররাষ্ট্রনীতির সুবাদে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেনÑ বিগত ১৫ বছরের দুর্বল কূটনৈতিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে দেশের ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা’ করা হয়েছে। বৈদেশিক মিশনগুলোর সার্বিক মূল্যায়ন সংক্রান্ত সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সফল ও সুদূরপ্রসারী পররাষ্ট্রনীতির বদৌলতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব মেরুদণ্ড সোজা করে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সামর্থ্য অর্জন করেছে। এই দিকনির্দেশনামূলক নেতৃত্বের উপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও সুসংগঠিতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া হবে।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর পারফরম্যান্স এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়ে এক সংসদ সদস্যের মূল্যবান প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন, বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, শ্রমিক রপ্তানি বাড়ানো কিংবা সর্বাধিক বাণিজ্য বিনিময়ে সফল মিশনগুলোর জন্য বর্তমানে কোনো বিশেষ ‘রিওয়ার্ড ব্যবস্থা’ বা পুরস্কার পদ্ধতি চালু আছে কি না তা পর্যালোচনার বিষয়।
তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছর জুড়ে যে দুঃশাসন চলেছিল, তাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনগুলো কার্যত বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। সে সময় দূতাবাসগুলোর সার্বিক কার্যক্রম, প্রবাসীদের সেবা দেয়া এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার ব্যাপারে পূর্ববর্তী সরকারের কোনো আগ্রহ বা কার্যকর তদারকি দৃশ্যমান ছিল না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই স্থবির ও অকার্যকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে।
কূটনৈতিক মিশনগুলোর জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়াতে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রতিটি দূতাবাসের কাজের মান মূল্যায়নে সরকার ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ (কেপিআই) ব্যবস্থা প্রস্তুত করছে। এই কেপিআই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে প্রতিটি দূতাবাসের কাজের মান ও গ্রেডিং নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, আগামী জাতীয় বাজেট পেশের সময় প্রতিটি দূতাবাসের সাফল্য, ব্যর্থতা ও কাজের হালনাগাদ তথ্য সংসদ সদস্যদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে, কারণ এ সকল তথ্য জানার পূর্ণ অধিকার সংসদ সদস্যদের রয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের আয়তন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং বৈশ্বিক কূটনীতির গুরুত্বের তুলনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল বলে সংসদে স্বীকার করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, বাজেট আলোচনায় ইতিপূর্বেও এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় বাজেট বৃদ্ধি ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বৈদেশিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
