জ্বালানি ভর্তুকির চাপে বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠছে

সহযোগীদের খবর

জ্বালানি ভর্তুকির চাপে বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠছে

ফন্ট সাইজ:

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘জ্বালানি ভর্তুকির চাপে বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠছে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়নি। এ কারণে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে কেনার খরচের চেয়ে বিক্রির দাম কম থাকার কারণে দুই মাসের লোকসান পোষাতে সম্প্রতি সরকারের কাছে সাত হাজার ৬১০ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিতে চলতি অর্থবছরের জন্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনের বকেয়া পরিশোধসহ চলতি অর্থবছরের মাত্র দেড় মাসেই বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ খাতেও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। বিদ্যুতে গত অর্থবছরে মাসে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগত। গত দুই মাসে প্রয়োজন হয়েছে মাসে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বাড়তি চাপ সার্বিক বাজেট ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কেটে যাবে– এমন প্রত্যাশা থেকে গত অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে ভর্তুকির বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় ধারণার চেয়ে অনেক বেশি দরে জ্বালানি কেনা লাগছে। বর্তমানের রাজস্ব আয়ে পরিস্থিতিতে এত ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে।

এপ্রিল থেকে লোকসান দিচ্ছে বিপিসি

বিপিসি জানিয়েছে, গত এপ্রিল ও মে মাসে সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করে তাদের লোকসান দিতে হচ্ছে। ওই দুই মাসের লোকসান পোষাতে সরকারের কাছে প্রায় সাত হাজার ৬১০ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি অর্থ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি এবং জ্বালানি তেল পরিবহনে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে এখনও অস্থিতিশীলতা রয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার পুরো চাপ দেশের বাজারে না দিয়ে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হলেও প্রকৃত সংগ্রহ মূল্যের তুলনায় তা নির্ধারণ করা হয়। মে মাসেও একই সিদ্ধান্ত ছিল।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৭৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এরপর মাসের বাকি সময়ে প্রতিদিন গড়ে লোকসান হয়েছে ৫৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এপ্রিলে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে বিপিসির মোট লোকসান হয়েছে দুই হাজার ২৭০ কোটি টাকা। মে মাসে শুধু ডিজেল বিক্রি করেই প্রতিদিন গড়ে ১৬৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বিপিসির। ওই মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।

আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্ধারণ শুরু হয়। এ ব্যবস্থায় প্রতি মাসে বিশ্ববাজারে আমদানির খরচ বিবেচনায় নিয়ে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। ফলে জ্বালানি তেলে সরকারের আলাদা করে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এর আগে কয়েক বছর বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করায় ভর্তুকির প্রয়োজন পড়েনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কারণেই চলতি বাজেটে জ্বালানি তেল খাতে কোনো ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়নি। এখন বিপিসির চাওয়া ভর্তুকি কোন খাতের বরাদ্দ থেকে দেওয়া হবে, তা নিয়ে সম্প্রতি অর্থ বিভাগে একটি বৈঠক হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা চলছে। অর্থ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখনও শেষ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের মোট ভর্তুকি ব্যয় গত অর্থবছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দেড় মাসেই এলএনজির বরাদ্দ শেষ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত জুন মাসের বকেয়া এবং চলতি অর্থবছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এলএনজি খাতে মোট প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। অথচ চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতেই বরাদ্দের চেয়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এলএনজি খাতে ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল। কিন্তু প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে– এমন প্রত্যাশায় ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর আগের বছরগুলোতেও এ খাতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা করে রাখা হতো। এবার গত অর্থবছরের চেয়ে খরচ বাড়বে মনে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানামুখী অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ খাতেও আর্থিক চাপ বাড়ছে। গত জুন ও জুলাই মাসে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ ভর্তুকি বাবদ মোট ব্যয় হয় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। পরের অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই মাসে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে পুরো অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ভর্তুকি সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বাড়তি অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা বড় প্রশ্ন। এ অবস্থায় ব্যয় সংকোচনের কোনো বিকল্প নেই। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ হলো অর্থনীতির প্রাণসঞ্চারকারী। মূল্যবৃদ্ধি হোক বা ভর্তুকি দিয়ে হোক, এ খাতে সরবরাহ সচল রাখতেই হবে। তা না হলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে জ্বালানি খাতের নীতিগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি।

মাহবুব আহমেদ আরও বলেন, দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। বাপেক্সের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করে উৎপাদন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর যেসব এলাকায় এখনও কার্যকর অনুসন্ধান হয়নি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। গত ১৫ বছরে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম সমকালকে বলেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এ অবস্থায় ভর্তুকির অর্থ জোগাড়ের বদলে কীভাবে ভর্তুকি ও ঘাটতি কমানো যায়, সে কৌশল নিতে হবে। জ্বালানি খাতে সমস্যা সমাধানে জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রকাশ্য ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা করতে হবে। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী জনগণই।

তিনি বলেন, জ্বালানি সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্ন মতামত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপে টেকসই সমাধান আসবে না। কোথায় কীভাবে ব্যয় বেড়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ব্যয়ের প্রতিটি স্তর কমাতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি খাতকে মুনাফামুখী না করে সেবামুখী করতে হবে। সরকার জনগণের সঙ্গে ব্যবসা করবে না; জ্বালানি ও খাদ্যের মতো মৌলিক পণ্যকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে।

শামসুল আলম আরও বলেন, বিগত সময়ে জ্বালানি খাতে ব্যাপক লুণ্ঠন হয়েছে। লুটপাট বন্ধ করতে পারলে বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব। লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে। মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন করার দায়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রথম আলো

‘সরকারের গুদামে সার আছে, সমস্যা বিতরণে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আগস্ট মাস দেশের প্রধান ধানের মৌসুম আমনের জমি প্রস্তুত করা ও চারা রোপণের সময়। চারা রোপণের পর কয়েক ধাপে কৃষককে জমিতে সার দিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে এ সময় সারের চাহিদা

বেশি থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। তবে সরকারের নথিপত্র অনুযায়ী, চাহিদার বিপরীতে সারের মজুত ও বরাদ্দে কোনো ঘাটতি নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাঁরা সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ডিলাররা ঠিকমতো সার উত্তোলন ও বিতরণ করছেন কি না, তা তদারক করার দায়িত্ব উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার-নির্ধারিত পরিবেশকেরা ভর্তুকির সার বাইরে কালোবাজারে বিক্রির কারণে সংকট দেখা দিচ্ছে। পরে খোলাবাজারে সেই সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক এলাকার সার অন্য এলাকায় পাচার করার অভিযোগে গত তিন দিনে রাজশাহীর ৪ উপজেলায় ৪ পরিবেশককে মোট ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে যশোরে ২ আগস্ট ২ পরিবেশককে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি মাসে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জেলাভিত্তিক সার বরাদ্দের আদেশ জারি হয়। প্রতি জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সার বরাদ্দ ও বীজ বিতরণ মনিটরিং কমিটি ডিলারভিত্তিক সার বরাদ্দের আদেশ জারি করে। এরপর ডিলার নির্ধারিত গোডাউন থেকে সার উত্তোলন করে থাকে। বরাদ্দ দেওয়া প্রতি মাসের সার সঠিক সময়ে উত্তোলন ও কতজন কৃষককে কতটুকু সার বিতরণ করা হচ্ছে, তা তদারকের দায়িত্ব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, ১০ হাজার ডিলার সারা দেশে সার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও মাঠপর্যায়ের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের হাত-পা। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আমরা আমদানি, বরাদ্দ সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ সংকট তৈরি করছে।’

এসব বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ফয়সল ইমাম বলেন, গত শনিবার জেলা পর্যায়ের তিন উপপরিচালককে বদলি করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যখন যেখানে গাফিলতি, অবহেলা ও যোগসাজশ পাওয়া যাচ্ছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারণ দর্শানো, ব্যাখ্যা তলব, প্রত্যাহার ও ক্ষেত্রবিশেষে দায়ী কর্মকর্তাদের বরখাস্তও করা হচ্ছে।

বরাদ্দ আছে, উত্তোলন কম

কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আগস্ট মাসের জেলাভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জেলাভিত্তিক সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলেও উত্তোলন হয়েছে কোথাও বরাদ্দের অর্ধেক, কোথাও তার চেয়ে কম।

ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আগস্টে গাজীপুরের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৮৭৬ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে সার বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮০০ মেট্রিক টন। নরসিংদী জেলায় আগস্টে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে বিতরণ হয়েছে ৯১৯ মেট্রিক টন।

আগস্টে ঢাকা বিভাগের ৮ জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ১৯ হাজার ৯১৮ হাজার মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ৮ হাজার ৯৬৫ হাজার মেট্রিক টন। অন্যান্য বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। যেমন ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৪২৫ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ৯ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। সিলেট বিভাগের চার জেলার জন্য আগস্টে বরাদ্দ ৯ হাজার ৫৪১ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন সার উত্তোলন করেছেন ডিলাররা।

সারা দেশে আগস্টের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ আছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬১২ টন।

গত রোববার কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, কুড়িগ্রামে আগস্টে সারের বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত ডিলাররা সার তুলেছেন তিন ভাগের এক ভাগ। অন্যান্য সার যেমন ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেও বরাদ্দের তুলনায় উত্তোলন অনেক কম বলে জানান তিনি।

টিএসপি সারের উত্তোলনও একইভাবে বরাদ্দের তুলনায় কম দেখা গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক সার সরবরাহ ও বিতরণের প্রতিবেদনে। কুমিল্লা জেলায় আগস্টে টিএসপি সারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩২৭ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে ৪৯৮ মেট্রিক টন। কুমিল্লা বিভাগের তিন জেলার জন্য টিএসপির মোট বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৭৭২ মেট্রিক টন। কৃষক পর্যায়ে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৭১ মেট্রিক টন। খুলনার চার জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ছিল আগস্টে ৪ হাজার ৩৩৭ মেট্রিক টন। বিতরণ করা হয়েছে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৬৩৭ মেট্রিক টন।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা: টাকা যাবে কার পকেটে প্রশ্ন সংসদীয় কমিটির’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার প্যাকেজ, খেলাপি ঋণের লাগামহীন চাপ এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটি। এর বাইরে রয়েছে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও আমানত সংকট। এর মধ্যেই মুদ্রানীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। কমিটির মতে, শুধু সুদের হার নয়; ব্যাংক খাতের গভীরে থাকা শাসন, জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আরও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে এ চিত্র। যুগান্তরের হাতে থাকা বৈঠকের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু নীতি সুদহার কমানো বা বাড়ানোর আলোচনাই করেননি তারা; বরং ঋণের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা সুবিধা পাচ্ছেন, খেলাপি ঋণ কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের দেওয়া প্রণোদনার অর্থ কার পকেটে যাচ্ছে, প্রকৃত সুফল উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন কি না-এসব প্রশ্নকেই সামনে এনেছেন কমিটির সদস্যরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।

কার্যবিবরণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই এবং রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এ প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ প্যাকেজের মাধ্যমে ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিপুল অর্থ শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার হাতে যাচ্ছে কি না-তা কঠোরভাবে তদারকির জন্য বলেছেন তারা।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা দুর্বলতা নিয়ে সদস্যরা সরাসরি প্রশ্ন, সমালোচনা ও একাধিক সুপারিশ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি থেকে শুরু করে খেলাপি ঋণ, ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি, ইসলামি ব্যাংকিং, বিশেষ অডিট, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা এবং সুদের হার-প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই বাড়তি নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন সংসদ-সদস্যরা।

বৈঠকে খেলাপি ঋণ নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে সংসদীয় কমিটি। তারা খেলাপি ঋণের দায় কার-এমন প্রশ্নও তুলেছেন। কমিটির সদস্যরা খেলাপি ঋণ আদায়ে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ঋণখেলাপি তৈরির ক্ষেত্রে শুধু ঋণগ্রহীতাই নয়, ঋণ অনুমোদনকারী পরিচালকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেন। কমিটি বলেছে, খেলাপি ঋণ কি শুধু ব্যবসায়ীর ব্যর্থতার ফল, নাকি ঋণ অনুমোদন ও ব্যাংক পরিচালনার ভেতরেও এর দায় রয়েছে? কমিটি এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

যদিও এ সময় বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মন্দ ঋণ বাড়তে থাকায় অনেক ব্যাংকে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে আর্থিক খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

৯ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি নয়-সুদহার নিয়ে চাপ: কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী বৈঠকে একাধিক সদস্য উচ্চ সুদহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উচ্চ সুদহারকে বড় বাধা হিসাবে তুলে ধরে দ্রুত নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন তারা। এমনকি নীতি সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিষয়টিও এ সময় আলোচনায় আসে। জানা গেছে, এর মাত্র কয়েকদিন পরই বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে রেপো রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে। ফলে সংসদীয় কমিটির আলোচনার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহারে পরিবর্তন আসে। তবে কমিটির আলোচনায় শুধু সুদহার কমানোর দাবি ছিল না; পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনীয়তার সুপারিশও উঠে আসে।

জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, শুধু উচ্চ সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাও মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ।

মুদ্রানীতি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় : বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তবে বৈঠকে এটিও স্পষ্ট করা হয়, মূল্যস্ফীতি শুধু চাহিদানির্ভর নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বাজারের প্রতিবন্ধকতা এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। এ অবস্থায় সংসদীয় কমিটি মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বনীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ করে।

একসঙ্গে কঠোর মুদ্রানীতি ও প্রণোদনার মধ্যে বিরোধ কোথায় : একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা-এই দুই নীতির মধ্যে সমন্বয় কতটা হচ্ছে, এমন প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে কমিটির বৈঠকে। কমিটি বলেছে, অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত কড়াকড়ি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ সময় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করার লক্ষ্য স্থির করার জন্য সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি।

হাই পাওয়ার্ড মানি নিয়ে প্রশ্ন : কমিটির একজন সদস্য বৈঠকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থায়ন এবং অর্থ সরবরাহের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনার ফলে অর্থ সরবরাহ কতটা বাড়বে, মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব কী এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর প্রকৃত অবদান কতটা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রণোদনার অর্থ যদি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে না গিয়ে অন্য খাতে প্রবাহিত হয়, তাহলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফলের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

ইসলামি ব্যাংকিং নিয়েও উদ্বেগ : বৈঠকে ইসলামি ব্যাংকিং খাত নিয়েও একাধিক সুপারিশ এসেছে। কার্যবিবরণীতে ইসলামি ব্যাংকিংকে মুদ্রানীতিতে আরও সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকগুলোর অতীতের অনিয়ম, শরিয়াহ বোর্ডের দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতে কমপ্লায়েন্স ও ডিউ ডিলিজেন্স জোরদারের জন্য সুপারিশ করে কমিটি।

বিশেষ অডিটের প্রস্তাব : ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু নিয়মিত পরিদর্শন যথেষ্ট নয় বলে মনে করে কমিটি। কয়েকটি ব্যাংকে পরিচালনার বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় তারা বিশেষ অডিটের প্রস্তাব দেন। অতীতের গোপন রাখা সমস্যা প্রকাশ্যে এনে ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান নিরূপণের সুপারিশ করেন তারা। কমিটির মতে, এটা না হলে কাগজে-কলমে একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এবং বাস্তব সম্পদমানের মধ্যে পার্থক্য থাকলে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে।

ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ব্যবস্থাপনায় নতুন নজর : কমিটি খেলাপি ঋণ দ্রুত শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে সুপারিশ করে। বিশেষ করে ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। কমিটির মতে, প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে সেই ঋণের সুবিধা কে নিয়েছেন, সেটি শনাক্ত করা জরুরি। এতে খেলাপি ঋণ কমে আসবে।

কালের কণ্ঠ

‘তেলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরছে, দ্রুত কমবে লোডশেডিং’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ত্বরিত পদক্ষেপে লোডশেডিং কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। এতে আশা করা যায়, লোডশেডিং কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাসশিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জানা যায়, দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। এর পরও দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে মানুষ। সম্প্রতি বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে লোডশেডিং। গ্রাম ছাড়িয়ে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা এখন শহরেও এসে ঠেকেছে।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে আট থেকে ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং হয়েছে। এতে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। যদিও এখন লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা কমেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও শিল্প—দুই খাতের সংকট একসঙ্গে মোকাবেলায় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে শিগগিরই শিল্পের দীর্ঘদিনের গ্যাসসংকট এবং বিদ্যুৎ খাতের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

একদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানো হবে। ফলে একই সঙ্গে লোডশেডিং ও শিল্পের গ্যাসসংকট কমানোর পথ তৈরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের সিদ্ধান্তের কথা আমাদের জানিয়েছে। বকেয়া বিল পরিশোধ ও হিসাব হালনাগাদ হলে কেন্দ্রগুলো আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারবে। বর্তমানে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বকেয়া বিল পরিশোধ করা হলে আরো প্রায় দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বকেয়া বিল না পাওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছিল না। ফলে আমাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। বকেয়া পরিশোধ করা হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদনে যেতে পারবে। এতে একদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং লোডশেডিং কমবে, অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।’

ডেভিড হাসনাত আরো বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ বিল বকেয়া জমেছে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো। গড়ে প্রায় ছয় মাসের বিল বকেয়া। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে। সরকার তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যার কারণে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়েছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, তখন সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত, সিন্ডিকেশন, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এই লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে হতো না সাধারণ মানুষকে। ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ এবং আগাম পরিকল্পনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, আপাতত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দ্রুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশও আসতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) যথাসম্ভব ফার্নেস অয়েল মজুদ করতে বলা হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন তেল বিতরণ কম্পানিতে তেলের মজুদ বাড়াতে বেশি করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান দামের কারণে পরিস্থিতিও কিছুটা বদলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও কাঙ্ক্ষিত সময়ে এলএনজি সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২৬ আগস্টের জন্য নির্ধারিত কার্গোও পাওয়া যায়নি। ফলে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘সরকার লোডশেডিং কমাতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে শিল্প খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

ইত্তেফাক

‘বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা, কাজ হারিয়েছেন ৬২ হাজার শ্রমিক’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্রে বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভসহ ১২টি খাতে অগ্রগতি অর্জিত হলেও, মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু ঋণসহ বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি শিল্প-কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।

গতকাল সোমবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস :একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠান হয়।

বিগত ছয় মাসের মূল্যায়ন তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিগত ছয় মাসের সার্বিক পর্যালোচনায় এই দুটির একটিতেও আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি, বরং দুই প্রত্যাশাতেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্বস্তি। বিগত সরকারের কাছ থেকে বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। টাকা সংকট, ব্যাংকিং খাতের করুণ দশা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে ছিল। তবে এগুলো সামলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আশানুরূপ গতি দেখা যায়নি। দুর্নীতি বন্ধ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট এবং ‘মব কালচার’ বন্ধ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে পদায়ন করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও দেশে মব ভায়োলেন্স অব্যাহত রয়েছে। নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, যার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি। গুম ও মানবাধিকার রক্ষায় তৈরি আইনে নানা ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে। বিশেষ করে, আইন ভঙ্গকারীকে দিয়ে অনুসন্ধান করানোর কারণে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

অবশ্য সরকারের কিছু সাফল্য রয়েছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ সরকার যখন আসে, তখন উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু কাঠামোগত অসুবিধা পেয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও তখন ইতিবাচক ছিল না। শুরু হয় যুদ্ধ। সমস্যা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে এ সরকার একটি সমন্বিত দলিল তৈরি করল না। এ কারণে এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বারবার বলছে যে তারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, তার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির পর্যালোচনার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে এবং নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। উত্পাদন খাতের পরিস্থিতিকে ‘শঙ্কাজনক’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি থেকে নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে। এসব সূচকে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। দেবপ্রিয় বলেন, রিজার্ভ বাড়া বা পুঁজিপণ্য আমদানির মতো কিছু সূচক ইতিবাচক দেখালেও সেগুলোর পেছনের কারণও বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়াটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ নাকি এটা রক্তশূন্যতার লক্ষণ? এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বিনিয়োগ না হওয়ার কারণে আমদানি কম হচ্ছে এর প্রভাবে রিজার্ভ বাড়ছে।

সিপিডির পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনটি শিল্পঘন এলাকা গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী এলাকায় ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। সেই বিবেচনায় রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছে সিপিডি।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘ঋণ নিয়ে পাচার ঠেকাতে কঠোর বাংলাদেশ ব্যাংক’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক লুটেরা এস আলমের মতো এক ধরনের অলিগার্ক শ্রেণী কাগুজে প্রকল্পের নামে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিতেন না। ঋণের একটি বড় অংশই পাচার হয়ে যেত। আবার এসব ঋণের অর্থ কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে তারও কোনো তদারকি করা হতো না। এর ধকল এখন পোহাচ্ছে ব্যাংকিং খাতসহ দেশের অর্থনীতি। সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের ভারে ব্যাংকিং খাতের অনেকটা ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া পাঁচ ব্যাংক মিলে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণের অর্থের অপব্যবহার, কাগুজে প্রকল্পের নামে অর্থ বের করে নেয়া ঠেকাতে এবার বড় ঋণের ব্যবহার সরাসরি তদারকিতে নামছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ কোথায় ও কিভাবে ব্যবহার হয়েছে তা যাচাই করতে অডিট রিপোর্ট জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর ফলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের পর ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না বরং ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সেটিও নজরদারির আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের ঝুঁকি যে কতটা বেড়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ইতোমধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়েছে। এক বছর আগে অর্থাৎ, মার্চ ২০২৫-এ এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মোট পরিমাণ ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ বড় ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি এসব ঋণের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। একমাত্র ব্যাংক লুটেরা এস আলমই ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। যার বেশির ভাগই পাচার হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিসহ বড় বড় কেলেঙ্কারি ঘটে আওয়ামী সরকারের ১৫ বছরে। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় শেষ পাঁচ বছরে। ২০১৭ সালের পর এস আলম একে একে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো দখলে নিয়ে লুটপাট চালায়। যার ধকল এখন ব্যাংকিং খাতসহ দেশের অর্থনীতি বহন করছে। ইতোমধ্যে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার সময় গ্রাহককে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য দেখাতে হয়। শিল্পকারখানা স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কাঁচামাল আমদানি, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা চলতি মূলধনের জন্য ঋণ নেয়া হলেও বাস্তবে সেই অর্থ অন্য খাতে চলে যাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠান, সহযোগী কোম্পানি বা ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরের ঘটনাও সামনে এসেছে। এ ধরনের অনিয়মের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- ব্যাংক যে অর্থ উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগের প্রত্যাশায় ঋণ দেয়, সেটি যদি উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে না গিয়ে সম্পদ কেনা, অন্য ঋণ পরিশোধ, বিদেশে অর্থ পাঠানো কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন হিসাবে চলে যায়, তাহলে ঋণের বিপরীতে প্রকৃত নগদ প্রবাহ সৃষ্টি হয় না। একসময় ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। এর বোঝা শেষ পর্যন্ত ব্যাংক, আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ঋণের অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি কিস্তিতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আগের কিস্তির অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে পরবর্তী কিস্তি ছাড় করার নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকির ওপর নির্ভর করলে বড় ঋণের অপব্যবহার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে এবার আরো শক্তিশালী ও স্বাধীন যাচাইব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এস আলমের ঘটনা বড় সতর্কবার্তা : ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে এস আলম গ্রুপের নাম। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে এস আলমসংশ্লিষ্ট ঋণ ও অর্থ পাচারের বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে বড় একটি অংশ বিভিন্ন কোম্পানি, শেল কোম্পানি ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেয়া হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক ৩২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণের তুলনায় জামানতের মূল্য ছিল অত্যন্ত কম। বিএফআইইউর অনুসন্ধানে ঋণের অর্থ হুন্ডি, বাণিজ্যিক লেনদেন ও অন্যান্য পদ্ধতিতে বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগও উঠে এসেছে। এই ঘটনা শুধু একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনিয়মের বিষয় নয়, এটি দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। কারণ কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত বিপুল অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বের করে নেয়া সম্ভব হওয়ার অর্থ হলো-ঋণ অনুমোদন, জামানত যাচাই, গ্রাহকের প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ এবং ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ-একাধিক স্তরেই দুর্বলতা ছিল।

বণিক বার্তা

‘এলএনজি আমদানি ব্যয় বছরে ছাড়াতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে গ্যাসের সংকট মেটাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা।

গ্যাসের ঘাটতি পূরণে সরকার আরো কয়েকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এরই মধ্যে একটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় থাকা টার্মিনালের মধ্যে অন্তত দুটিও যদি নির্মাণ হয়, তাহলে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈশ্বিক বাজারদর ও সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধির হিসাব বিবেচনায় নিলে বছরে এলএনজি আমদানি ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। আর বিদ্যমান স্পট প্রাইস বিবেচনায় ধরলে এ ব্যয় অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে বলেও মনে করেন তাদের কেউ কেউ।

এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ অর্থ জোগাতে গিয়ে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, ভর্তুকি, বিদেশী ঋণ ও গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের (জিডিএফ) দ্বারস্থ হতে হয়েছে পেট্রোবাংলাকে। অন্যদিকে টার্মিনাল দিয়ে গ্যাস সরবরাহে দুর্ঘটনা, ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গ্যাস সরবরাহে সংকটের ঘটনাও ঘটেছে।

দেশে চলমান গ্যাস সংকটে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে এবং কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবাসিক খাতও ভোগান্তি পোহাচ্ছে। ভবিষ্যতে গ্যাস সংকট মোকাবেলায় এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি পরিকল্পনা এবং টার্মিনাল নির্মাণ ব্যয় সরকারকে আর্থিকভাবে বড় চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। দুটি টার্মিনালের সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা)। একই সক্ষমতার আরো অন্তত দুটি টার্মিনাল যদি নির্মাণ করা হয়, সেক্ষেত্রে বিদ্যমান এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা দ্বিগুণে উন্নীত হবে। সেক্ষেত্রে দেশে এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। দেশে গত অর্থবছরে এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছে ১১৩টি। এসব কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছে মোট ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি লেগেছে আরো ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত অর্থবছরের এলএনজি আমদানি ব্যয় এবং কার্গোর সংখ্যাকে ভিত্তি ধরলে এবং দুটি নতুন টার্মিনাল নির্মিত হলে এ ব্যয় নিঃসন্দেহে দ্বিগুণ হবে। তবে আমদানির পরিমাণ ও দামের উত্থান-পতনে হিসাবের পরিবর্তন হতে পারে। যদিও দামের বিষয়টি বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করছে, যেমন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হওয়া এবং বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতি।

এমন পরিস্থিতিকে অস্বীকার করছেন না পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। তারা বলছেন, দেশে মোট এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা চারটি হলে এবং সেগুলো দিয়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ না হলেও বছরে অন্তত লাখ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তাদের ভাষ্য, দেশে এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি বেশ কয়েকটি চুক্তি রয়েছে। সেই গ্যাস আমদানি শুরু হলে স্পট থেকে কার্গো আমদানির সংখ্যা কমে আসবে, তখন ব্যয়ও কমে যাবে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে চলতি অর্থবছরে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির কথা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতার কারণে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি কমে গেছে। স্পট থেকে কার্গো আমদানি করে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। বিদ্যমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হতে পারে ৯০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি রাখা হয় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা, যদিও অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেই পেট্রোবাংলা ভর্তুকি নিয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।

জ্বালানি খাতবিষয়ক থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’ (আইইইএফএ) গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে গ্যাসের নতুন আবিষ্কার সীমিত হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামে অস্থিরতা থাকলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন (১২৩ টাকা হিসাবে ১ লাখ সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা) ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ হিসাবে এলএনজির গড় মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ১২ ডলার। এলএনজির উচ্চমূল্য এবং সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি আরো বাড়তে পারে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।

এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতে তার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে আইইইএফএ-প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি ব্যয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আগামীতে আরো বেড়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিগত সরকারের গ্যাস সরবরাহ পরিকল্পনায় দুটি ভাসমান টার্মিনাল ও একটি ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল। এসব টার্মিনাল যদি বর্তমান সরকার নির্মাণ করে এবং তা ৬৫ শতাংশ ক্যাপাসিটিতেও চলে, তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ ৭৩০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। এ গ্যাস আমদানি করে মেটাতে হলে অন্তত ৮ বিলিয়ন ডলার এলএনজির জন্য প্রয়োজন হবে (প্রতি এমএমবিটিইউ ১২ ডলার)। তবে বর্তমান দাম ধরে হিসাব করলে এ অর্থের পরিমাণ আরো কয়েক বিলিয়ন ডলার বেশি হতে পারে। এ ব্যয় মেটানোর মতো সক্ষমতা আমাদের হবে কিনা সেটাই কিন্তু বড় প্রশ্ন? আমরা এখনই হিমশিম খাচ্ছি।’

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই স্পট মার্কেটে জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এলএনজি জেকেএমের (জাপান-কোরিয়া মার্কেট) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ওঠানামা করছে ২২ ডলার ৯৪ সেন্টের কিছু বেশিতে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৮ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়েছে। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১১৪ শতাংশ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ ডলার ৭২ সেন্ট, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ ডলার ৯৪ সেন্টে।

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা: সহিংসতার শঙ্কায় সতর্ক পুলিশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা করছে পুলিশ। এ জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা এড়াতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি এবং এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ১৮ আগস্ট সব ইউনিটকে এসব নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা জানিয়ে ইউনিটগুলোকে তা মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এরপর ২২ আগস্ট একই ধরনের নির্দেশনা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) বিভিন্ন বিভাগেও পাঠানো হয়।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সদর দপ্তরের ওই চিঠিতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সহিংসতার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সন্দেহভাজন নেতা-কর্মীদের নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং জামিনে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধির বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে বলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্কতামূলকভাবে আগাম তথ্য সংগ্রহ করছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশকে এসব বিষয়ে অবহিত করে সতর্ক থাকার ওপর জোর দেওয়া পুলিশের নিয়মিত কাজ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সেদিন দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় ২০২৫ সালের মে মাসে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে তা স্থায়ী বৈধতা লাভ করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়।

এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। রাজউকের পূর্বাচলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির দায়েও তাঁর কয়েক বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে এক অডিও সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাঁর সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা ও দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণার বিষয়ে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনো গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের গ্রহণ করবে না। বিদেশে বসে আওয়ামী লীগ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সরকার এসব বিষয়ে নজর রাখছে।

পুলিশের সূত্র জানায়, পুলিশের গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে গোপনে সংঘবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশঙ্কা করছে, এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা বাড়তে পারে।

দেশ রূপান্তর

‘ঢালাও ফাঁসির শাস্তি পেলেন বিচারক’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সময়ের হিসাবে সাত বছরের বেশি। ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার ঘটনা আলোড়ন তৈরি করেছিল সারা দেশে। উচ্চ আদালতে সেই হত্যা মামলার রায় হয়েছে গতকাল। এতে ফেনীর বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে মাত্র দুজনের সাজা বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজনের সাজা কমে হয়েছে যাবজ্জীবন, আর বাকি ১০ জন পেয়েছেন খালাস। ২০১৯ সালে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ১৬ আসামির সবাইকে প্রাণদণ্ড দিয়ে যে রায় দিয়েছিলেন তার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট। এমনকি তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

উচ্চ আদালত বলেছে, রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারক মামুনুর রশিদ তার বিচারিক মানসিকতা ও বিচারিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেননি। এ কারণে তাকে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নিতে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার এ বিচারিক কর্মকর্তা বর্তমানে নিম্নতম মজুরি বোর্ডে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি এই প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে যোগ দেন।

১৬ জনের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তখনকার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, তার সহযোগী ও ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীম। হাইকোর্টে যাদের মৃত্যুদণ্ড কমে যাবজ্জীবন হয়েছে তারা হলেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আব্দুল কাদের, প্রভাষক আবছার উদ্দিন, শিক্ষার্থী কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মহি উদ্দিন শাকিল, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি এবং মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন।

ফেনীর সোনাগাজীতে স্থানীয় ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (পরে বরখাস্ত) এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে একই মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি যৌন নির্যাতনের অভিযোগে থানায় মামলা করলে অধ্যক্ষ ও তার অনুসারীদের রোষানলে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টার ভবনের ছাদে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় সিরাজসহ ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই। বিচারের শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক মামুনুর রশিদ। এরপর ডেথ রেফারেন্স মামলা আসে হাইকোর্টে। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামিরা আপিল ও জেলা আপিল করেন। হাইকোর্টে গত ২৮ জুলাই এ মামলায় শুনানি শুরু হয়। মোট ১৭ কার্যদিবস রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষে শুনানি শেষে গতকাল রায় দেয় আদালত।

হাইকোর্টের রায়ে যা বলা হয়েছে: আলোচিত এ মামলার রায় শুনতে গতকাল সকাল থেকে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট আদালতের (২৯ নম্বর এজলাস) সামনে ভিড় করেন ভুক্তভোগী পরিবার ও আসামিদের স্বজন, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারকরা। পৌনে দুই ঘণ্টায় পঠিত রায়ে নুসরাত হত্যা মামলায় ঢালাও ফাঁসির রায় দেওয়ায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তখনকার বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক বিবেচনাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

আদালত বলেছে, ঢালাও ফাঁসি দিয়ে আসামিদের পরিবারকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বিচারের সময় বিচারকদের বিচারিক মননের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দিয়ে ১০ জনকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। এ রায় শুনে আদালতের বারান্দায় অবস্থান করা দণ্ড থেকে মুক্ত কয়েকজন স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিদের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ সম্পর্কে আদালত বলেছে, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া অনেকটা ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’ অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিশিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, সেটা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।”

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি (বিচারিক আদালতের বিচারক) এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কাকে কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার কতটুকু সম্পৃক্ততা, সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং, অর্থাৎ ফৌজদারি মামলার বিচার এবং দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘নানা শর্তে আটকা রোহিঙ্গা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী ঢলের ৯ বছর পূর্ণ হলো আজ। গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলেও বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ। রোহিঙ্গারা নিজেরা ফেরত যেতে চাইলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শর্তে তাদের জীবন আটকে আছে ক্যাম্পেই। এখন তারা শুধু আলোচনারই বিষয়। আন্তর্জাতিক সভা সেমিনার, দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় এবং আঞ্চলিক নানা উদ্যোগেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কার্যকর কোনো সমাধানই পাওয়া যায়নি। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় অনেক পেরিয়ে গেছে বাংলাদেশের এখন রোহিঙ্গা নীতি পরিবর্তন প্রয়োজন। ভাবতে হবে নতুন পথ এবং নতুন কোনো পদ্ধতি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন সময় আরও রোহিঙ্গা নাফ নদ পেরিয়ে আসতে থাকে বাংলাদেশে। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা জানায় ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকার। সে সময় ক্যাম্পগুলোতে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৫৭ জন রোহিঙ্গা ছিলেন। অন্যদিকে ইউএনএইচসিআরেরর ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এখন ৯ বছর পর বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। সবশেষ ২০২৩ সালের শেষ দিকে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ৩৩টি ক্যাম্পে আছে ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন এবং নোয়াখালীর ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরে আছেন ৩৩ হাজান ৬৫৯ জন রোহিঙ্গা। ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত না পাঠাতে পারলেও নতুন করে আশ্রয় নিয়েছেন আরও অন্তত সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা। নিবন্ধিতদের বাইরেও আরও প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা আছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা।

বারবার ব্যর্থ উদ্যোগ: ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহ, মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তার ঘাটতির কারণে তা কার্যকর হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য কূটনৈতিক তৎপরতায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য তারা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের নিবন্ধিত বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়েছে। রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন, চলাচলে বাধা এবং খাদ্য ও জীবিকার সংকটও রয়েছে। ফলে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

দরকার নতুন কৌশল : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নীতি নতুন করে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এজন্য দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের বাইরে গিয়ে ‘আরাকান স্টেবিলাইজেশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় নানা উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ কোনো কাজে আসেনি। ফলে ‘আরাকান স্টেবিলাইজেশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে তা স্বাভাবিকভাবেই রাখাইনের ওপর দিয়েই যাবে। ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, এই ইকোনমিক করিডরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমস্যার সমাধানও সম্ভব। চীন যেহেতু ইকোনমিক করিডরের প্রস্তাব দিয়ে সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে তা কাজে লাগানো দরকার। তবে তার আগে গবেষণা করে দেখা দরকার এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কী লাভ হবে এবং রোহিঙ্গা সমস্যা কীভাবে সমাধান হতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৯ বছর অনেক ধরনের চেষ্টাই তো করা হলো। এখন নতুনভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আমরা মূলত জাতিসংঘকেন্দ্রিক চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিকভাবে এটা অনেক বড় পরিসর হলেও এই সমস্যার সমাধানে দুই-তিনটা শক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তারা একটু সক্রিয় হলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব। এর মধ্যে চীন ও আশিয়ান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম গতকাল বলেছেন, সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের সমস্যা সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গাদের এই বিপর্যয়ের কথা আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার বলে আসছি। রোহিঙ্গাদের যাতে সম্মানজনক ও নিরাপদে প্রত্যাবাসন করা হয় সেই দাবি জানানো হচ্ছে।রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত জীবনের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, দশ বছর অনেক লম্বা সময়। কিন্তু ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য দশ বছর হচ্ছে তার শৈশব। একজন যুবকের জন্য এটা পড়াশোনাহীন থাকা। একটি পরিবারের জন্য এটা ঘরবাড়িহীন একটি দশক। আর একটি সম্প্রদায়ের জন্য এটি অনিশ্চয়তায় জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। আমরা দশ বছরকে বিশ বছর হতে দিতে পারি না।