সত্য, আত্মসংযম ও অহিংসা নিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর দৈনিক ভাবনার একটি ঐতিহাসিক সংকলন নিলামে রেকর্ড ১৬.২০ কোটি রুপিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি) বিক্রি হয়েছে। গত বুধবার অনুষ্ঠিত স্যাফ্রনআর্টের নিলামে বিক্রি হওয়া এই দলিল ভারতীয় কোনো ঐতিহাসিক নথির নিলামমূল্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে।
‘এ থট ফর দ্য ডে’ নামে বই আকারে সংকলিত এই আর্কাইভে ২৩ মাস ধরে লেখা গান্ধীর ৬৮৮টি তারিখযুক্ত ভাবনা রয়েছে। এতে গান্ধীর নৈতিক চিন্তা, আত্মসংযম এবং ব্যক্তিগত জীবনে দেয়া দিকনির্দেশনার প্রায় ধারাবাহিক একটি চিত্র পাওয়া যায়।
গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শিষ্য আনন্দ টি. হিঙ্গোরানির জন্য এসব ভাবনা লেখা হয়েছিল। ১৯৩০ সালে হিঙ্গোরানির সঙ্গে গান্ধীর প্রথম পরিচয় হয়। পরে তিনি সাবরমতী আশ্রমে গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। তিনি ডান্ডি অভিযানে অংশ নেয়ার পাশাপাশি আইন অমান্য আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে হিঙ্গোরানি গান্ধীর লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশক ও সংরক্ষক হয়ে ওঠেন। তাঁর পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহাসিক নথিগুলো সংরক্ষণ করে আসছিল। হিঙ্গোরানি ১৯৯৯ সালে মারা যান।
স্যাফ্রনআর্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট মিনাল ভাজিরানি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, গান্ধী প্রতিদিন কিছু সময় আলাদা করে একটি ব্যক্তিগত ভাবনা লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শুরুতে বিষয়টি ছিল ব্যক্তিগত যোগাযোগের অংশ। পরে তা একটি যৌথ প্রকল্পে রূপ নেয়। গান্ধী প্রতিটি ভাবনা নিজে লিখতেন, আর হিঙ্গোরানি ছিলেন এর প্রাপক, সংগঠক ও অনুলিপিকার। শেষ পর্যন্ত তিনি এসব লেখা প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করেন।
গান্ধী ও হিঙ্গোরানির এই যোগাযোগের শুরু হয়েছিল ‘সহমর্মিতার একটি উদ্যোগ’ হিসেবে। হিঙ্গোরানির স্ত্রী বিদ্যার মৃত্যুর পর গান্ধী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হিঙ্গোরানি তখন শ্রবণশক্তির সমস্যার জন্য প্রাকৃতিক চিকিৎসাও নিচ্ছিলেন। হিঙ্গোরানি পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় তিনি গান্ধীর কাছে নিজের গভীর একাকিত্ব ও শোকের কথা জানিয়েছিলেন।
মিনাল ভাজিরানি বলেন, গান্ধীকে সাধারণত তাঁর বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর জন্য স্মরণ করা হয়। কিন্তু এই নথি দেখায়, ব্যক্তিগত ও দৈনন্দিন সম্পর্কের ওপরও তিনি সমান গুরুত্ব দিতেন।
‘এ থট ফর দ্য ডে’ ছিল ‘গান্ধী: ফ্রম দ্য কালেকশন অব আনন্দ টি. হিঙ্গোরানি’ শীর্ষক ৮৬টি লটের একটি বিশেষ নিলামের অংশ। নিলামে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মুহূর্তের স্মারক এবং গান্ধী-হিঙ্গোরানির বন্ধুত্ব, পরামর্শ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের নিদর্শন তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল চিঠি, পাণ্ডুলিপি, ডাকটিকিট-সংক্রান্ত সামগ্রী ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন।
স্যাফ্রনআর্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা দীনেশ ভাজিরানি বলেন, ‘এ থট ফর দ্য ডে’-এর প্রতি ক্রেতাদের অসাধারণ আগ্রহ এর দুর্লভতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। ৬৮৮টি ভাবনা একত্রে গান্ধী কীভাবে প্রকাশ্যে যে নীতিগুলোর কথা বলতেন, ব্যক্তিগত জীবনেও সেগুলো অনুসরণ করতেন- তার একটি বিরল অন্তর্দৃষ্টি দেয়। এ কারণে এটি তাঁর চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির অত্যন্ত মূল্যবান একটি দলিল।
নিলামে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন উল্লেখযোগ্য দামে বিক্রি হয়েছে। ‘মেসেজ অন গড’- গান্ধীর ঈশ্বর ও ভগবদ্গীতা নিয়ে ভাবনাসংবলিত তিনটি পাণ্ডুলিপি ও চিঠির সমন্বিত একটি সংগ্রহ বিক্রি হয়েছে ১.৬৮ কোটি রুপিতে।
এ ছাড়া গান্ধীর পেটি চরকা এবং চরকা কাটার আধ্যাত্মিক অনুশীলন নিয়ে দুটি চিঠি ১.০২ কোটি রুপিতে এবং গান্ধীর লেখা অবস্থার একটি স্বাক্ষরিত উপহার হিসেবে দেয়া আলোকচিত্র ৭৮ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছে।
