ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুরক্ষার জন্য কৃষকরা জমিতে যেসব রাসায়নিক সার ও প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর (পিজিআর) ব্যবহার করছেন, তার বড় অংশই মানহীন ও ভেজাল। সরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গবেষণাগারে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় এই চিত্র ধরা পড়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এসব রাসাায়নিকে যেসব উপাদান থাকার কথা তার কিছুই নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা আসল রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তে রঙ, পানি, তেল কিংবা কার্যকারিতাহীন গুঁড়া দিয়ে এসব পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছে। এসব ভেজাল রাসাায়নিক দ্রব্য তৈরি করে কৃষকের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে দেদারছে। ফলে ফসল ও জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশের মারাত্মকরকম ক্ষতি করছে। এতে কৃষকরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
নমুনা পরীক্ষা:
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায় থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্যের স্যাম্পল বা নমুনা ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। ল্যাব টেস্টের এই ফলাফলে দেখা যায়, দেশের অনেক নামী-দামী ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে এসব ভেজাল রাসায়নিক দ্রব্য বাজারজাত করে আসছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী যেসব পণ্যে নির্দিষ্ট মাত্রার উপাদান থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে বাস্তবে উপস্থিতি পাওয়া গেছে নগণ্য পরিমাণে। বাজার থেকে সংগৃহীত ৫৯টি নমুনার ল্যাব পরীক্ষায় অন্তত ১৪টি কোম্পানির উৎপাদিত ও বাজারজাতকৃত পিজিআরে ভয়াবহ কারসাজি, উপাদানের চরম ঘাটতি এবং জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে অধিদপ্তর।
ভেজালের চিত্র:
দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এতে ১২৫০ পিপিএম ৪-সিপিএ থাকার কথা, অথচ আছে মাত্র ২০০ পিপিএম। যার ব্যহার করে কৃষকের ফসলের কোনো লাভ হবে না, বরং ক্ষতি হবে। সবেচেয়ে বেশি মাত্রার ভেজাল পাওয়া গেছে কীটনাশক আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন এসোসিয়েশনের সভাপতি এম সায়েদুজ্জামানের প্রতিষ্ঠান মিমপেক্স এগ্রোক্যামিকেল লিমিটেডের রাষায়নিকে। এ প্রতিষ্ঠানের হিউমিক এসিডের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে উপকরণ থাকার কথা ১২.৫০ শতাংশ, অথচ এতে আছে মাত্র ০.০৪%। অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানের রাসাায়নিকের ৯৯ ভাগই ভেজাল। একইভাবে মেসার্স এডভান্স কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ন্যাপথালিক এসিটিক এসিডের নমুনা টেস্ট করে দেখা গেছে যে উপকরণ ৯৮ শতাংশ থাকার কথা, সেটি আছে মাত্র ০.১১ শতাংশ। এছাড়া ফসল এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৪-সিপিএর নমুনা টেস্টে দেখা গেছে, উপকরণ থাকার কথা ১২৫০ পিজিআর, অথচ আছে মাত্র ২০০ পিজিআর। আবার মেসার্স আইসিআই এগ্রিকেয়ারের হিউমিক এসিডের নমুনা টেস্ট করে দেখা গেছে, এতে প্রয়োজনীয উপকরণ ৭২ শতাংশ থাকার কথা, অথচ আছে মাত্র ১৪.৮১ শতাংশ। তাছাড়া কামিস্ট ক্রপ কেয়ার লিমিটেডের ৪-সিপিএর নমুন টেস্ট করে দেখা গেছে এতে ১২৫০ পিপিএমএর বদলে আছে মাত্র ৪৫০ পিপিএম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ল্যাব টেস্টে এগুলোকে সম্পূর্ণ ভেজাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের রাসাায়নিকের নমুন পরীক্ষায় দেখা গেছে এগুলো খবই নিম্ন মানের। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের প্রতিষ্ঠান টেনস এগ্রো লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের রাসাায়নিকের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে-এর ৪-সিপিএতে ১২৫০ পিপিএমএর বদলে আছে মাত্র ৬৫০ পিপিএম। একইভাবে ইস্পাহান এগ্রো লিমিটেডের ৪-সিপিএতেও ১২৫ পিপিএমএর বদলে আছে মাত্র ৬৫০ পিপিএম, মার্শাল এগ্রোভেট ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজের হিউমিক এসিডে আছে মাত্র ৩.৪৪ শতাংশ। গ্লোবাস এগ্রোভেট লিমিটেডের হিউমিক এসিডে ১৬ শতাংশ উপকরণ থাকার কথা, অথচ আছে মাত্র ৭.৬০ শতাংশ। এসএ এম এগ্রো কেমিক্যালের হিউমিক এসিডে ৭২ শতাংশের বদলে আছে মাত্র ৩২.৪৫ শতাংশ। এছাড়া মেসার্স ইস্ট-ওয়েস্ট কেমিক্যালের ৪-সিপিএ তে ১২৫০ পিপিএমএর বদলে আছে ৭৫০ পিপিএম, গ্লোন্ডেন ক্রপ কেয়ারের ৪-সিপিএতে ১২৫০ পিপিএমএর বদলে আছে ৭৫০ পিপিএম। এভাবে আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের রাসাায়নিক খুবই নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে কৃষকের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।
এসব কৃষি রাসাায়নিক পণ্যের ল্যাব টেস্টের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরজমিন উয়িংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান বলেন, আমরা সারা দেশ থেকে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন কোম্পানির কীটনাশক, রাসাায়নিক উপকরণসহ বিভিন্ন উপকরণ নমুনা সংগ্রহ করে থাকি। এসব নমুনা কখনো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ল্যাবে, কখনো সাইন্সল্যাবরেটরিতে আবার কখনো ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। তার অংশ হিসেবে আমরা সম্প্রতি বেশ কিছু কৃষি রাসাায়নিক উপাদানের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্ট করা হয়। এতে অনেকগুলো কোম্পানির রাসাায়নিক উপাদান ভেজাল ও মিন্মমানের বলে প্রমাণ মেলে। আমরা এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন এসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলে তারা কেউই ফোনকল রিসিভি করেননি।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঙ্ক্ষিত উপাদান না থাকায় কৃষকরা এসব হরমোন ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অবিলম্বে এসব প্রতারক ও ভেজাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া এবং এসব ব্যাচের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে নামী-দামী অনেক কোম্পানির চটকদার বিজ্ঞাপন আর চকচকে প্যাকেট দেখে চোখ বন্ধ করে এসব কৃষি উপকরণ কিনছেন সাধারণ কৃষক। অথচ ল্যাবের সরকারি পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে এসব উপকরণ ভেজাল। এতে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক:
অসাধু চক্রের এমন কর্মকাণ্ডে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা। পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করে জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করলেও কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না। একদিকে রাসায়নিকের নামে বিষাক্ত ও মানহীন উপাদান ব্যবহারে পরিবেশ ও জমির স্বাভাবিক জৈব উর্বরতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ফসলের ক্ষতি হয়ে চরম আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক।
বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচার্স এসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই সমস্ত নিম্নামানের ও ভেজাল কৃষি রাসায়নিক যদি কৃষকের হাতে যায় তাহলে কৃষক যে উদ্দেশে তার ফসলে এসব প্রয়োগ করে সে উদ্দেশ্য সফল হবে না। অর্থাৎ কৃষক এসব ভেজাল রাসাায়নিক জমিতে প্রয়োগ করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এসব রাষায়নিকে যে সক্রিয় উপাদানটা থাকার কথা ছিল তা শতভাগের মধ্যে ৯৯ শতাংশই নাই। এসব উপাদান না দিয়ে শুধু পানি আর গন্ধযুক্ত রঙ দিয়েই তারা এসব ভেজাল কীটনাশক বাজারজাত করছে। বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসাবে দায়িত্বে থেকে তিনি নিজেই এভাবে ভেজাল কীটনাশক আমদানি করে সারা দেশে বাজারজাত করছে।
কৃষি রাসায়নিকে ভেজাল: ল্যাব টেস্টে মিললো প্রমাণ
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অর্থ বাণিজ্য
৩৮ মিনিট আগে
২৩ আগস্ট (রবিবার), ২০২৬, ৬ঃ২২ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
