দেবাশীষ পরিবারের শেষযাত্রা

কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ড

দেবাশীষ পরিবারের শেষযাত্রা

ফন্ট সাইজ:

কলকাতার আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তকে পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ার মহাশ্মশানে বাবা-ছেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

একই ঘটনায় নিহত দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন ও শ্বশুর মো. আকরাম আলীকে মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে দাফন করা হয়েছে।

এর আগে শনিবার বিকেল ৫টার দিকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে দেবাশীষসহ পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কফিনে মোড়ানো সহকর্মীর মরদেহ দেখে সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাংবাদিকরা। সন্ধ্যা ৬টার দিকে মরদেহগুলো নিয়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হন স্বজন ও সংবাদকর্মীরা।

সন্ধ্যার পর থেকেই প্রিয় সহযোদ্ধা দেবাশীষকে শেষবারের মতো দেখতে তার আড়ুয়াপাড়ার বাড়ির সামনে সহকর্মীসহ হাজারো মানুষ জড়ো হতে থাকেন। রাত ১০টার দিকে দু’টি অ্যাম্বুলেন্সে করে চারজনের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য, স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্য ছিল বাবা ও ছেলেকে পাশাপাশি সমাধিস্থ করার মুহূর্ত। জীবদ্দশায় যে বাবা ছিলেন সন্তানের আশ্রয়, মৃত্যুর পরও যেন সেই বন্ধন অটুট রইল। পাশাপাশি সমাধিতে শায়িত বাবা-ছেলেকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দেবাশীষ দত্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং তার স্ত্রী আফসানা শারমিন ছিলেন মুসলিম পরিবারের সন্তান। তবে বিয়ের পরও কেউ ধর্ম পরিবর্তন করেননি। দু’জনই নিজ নিজ ধর্ম পালন করতেন। মৃত্যুর পরও তাদের শেষকৃত্য নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়েছে।

দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত জানান, তার পুত্রবধূ আফসানা শারমিন জীবিত অবস্থায় তার মাকে জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার মরদেহ দাফন করা হয়।

শারমিনের মা জানান, মেয়ের ইচ্ছা অনুযায়ী মুসলিম ধর্মীয় রীতিতে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রাত আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়া মডেল মসজিদে জানাজা শেষে আফসানা শারমিন ও তার বাবা আকরাম আলীকে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়।

দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ ছিলেন। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত তিনি কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং চ্যানেল নাইন ও দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

পেশাগত জীবনে সততা, সাহসিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের জন্য সহকর্মীদের কাছে প্রশংসিত ছিলেন দেবাশীষ। তার মৃত্যুতে একটি পরিবার যেমন একসঙ্গে চারজনকে হারিয়েছে, তেমনি কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতাও হারিয়েছে একজন সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ সংবাদকর্মীকে। তার মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

সহকর্মীরা বলেন, ‘দেবাশীষ শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সহকর্মীদের আপনজন। তার অকাল মৃত্যু কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতায় অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে। মর্মান্তিক এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, সাত বছর বয়সী মেয়ে মাহিমাকে দাদা-দাদির কাছে রেখে গত ৩ আগস্ট চিকিৎসার জন্য ভারতের বেঙ্গালুরুর উদ্দেশে রওনা হন দেবাশীষ। অন্যদিকে আরেক জামাতা ফিরোজের চিকিৎসার জন্য ৬ আগস্ট কলকাতা যান আকরাম আলী। ফিরোজ দেশে ফিরলেও আকরাম আলী কলকাতায় থেকে যান। পরে দেবাশীষ, তার স্ত্রী ও ছেলে সেখানে তার সঙ্গে যোগ দেন। বুধবার নিউমার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষে তাদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি ছিল।

এর মধ্যেই কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় নিহত নয়জনের মধ্যে ছিলেন কুষ্টিয়ার দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম আলী।

একসঙ্গে চারজনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ কুষ্টিয়া। শেষ বিদায়ে সাংবাদিক দেবাশীষ ও তার ছোট্ট ছেলে স্বর্ণশীষ পাশাপাশি শায়িত হলেন, আর একই কবরস্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় গেলেন আফসানা ও তার বাবা আকরাম আলী।