টিপস চাইছে রোবট, আসলে কার পকেটে যাচ্ছে অর্থ?

টিপস চাইছে রোবট, আসলে কার পকেটে যাচ্ছে অর্থ?

ফন্ট সাইজ:

রোবট এখন তাদের ডিজিটাল হাত বাড়িয়ে বকশিশ বা টিপ চাইছে। লাস ভেগাসের ‘দ্য টিপসি রোবট’ নামের এক বার রয়েছে। সেখানে এক চমকপ্রদ আয়োজন রয়েছে। দুটি রোবোটিক বাহু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ককটেল বানিয়ে দেয়। পর্দার ‘মার্গারিটা’ বোতামে চাপ দিতেই নড়েচড়ে উঠে রোবট দুটি। চমৎকার ভঙ্গিতে তারা টাকিলা, লেবুর রস ও ট্রিপল সেক মিশিয়ে সামান্য নাটুকে কায়দায় শরীর দুলিয়ে গ্লাসটি এগিয়ে দেয়। বিশ বছর আগে এমন দৃশ্য রোমাঞ্চ জাগালেও আজ তা প্রায় সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানীয়টির দাম ছিল ১৭ ডলার। কিন্তু রসিদে দেখা গেল অতিরিক্ত ১০ ভাগ ‘সার্ভিস ফি’ যোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ টিপসি নামের ওই রোবটটিও বকশিশ চেয়েছে।

নিউইয়র্কের ‘আর্টলি কফি’র এক রোবট বারিস্তাও এভাবে বকশিশ চায়। নেওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এক কর্মীহীন কিয়স্কে সেলফ-চেকআউট মেশিনে পানির বোতল কেনার পরও টিপ দেওয়ার পরামর্শ ভেসে উঠেছিল। অন্যদিকে ওরেগনের পোর্টল্যান্ডের ‘টপ বার্মিজ’ রেস্তোরাঁয় এক মানবকর্মী খাবারের অর্ডার নিলেও টেবিল পর্যন্ত খাবার এগিয়ে দিয়েছিল একটি রোবট সার্ভার। মানুষ ওয়েটারের জন্য সানন্দেই ২০ ভাগ টিপ দেওয়া যায়, কিন্তু রোবটের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রোবট যখন ডিজিটাল হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন টিপ দেওয়ার চিরাচরিত নিয়মগুলো আর খাটেনা। কারণ এই টাকা আসলে কে পাচ্ছে তা প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে। তবে এটি কি নতুন কোনো স্বাভাবিক প্রবণতা, নাকি ক্ষণস্থায়ী এক রোবট-হুজুগ? এর উত্তর নির্ভর করছে ভোক্তারা তাদের পকেট কীভাবে ব্যবহার করছেন তার ওপর। ‘দ্য টিপসি রোবট’ ও ‘আর্টলি কফি’র প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাদের মানবকর্মীরাই সমস্ত টিপের টাকা ভাগ করে নেন এবং কোম্পানি এর থেকে কিছুই পায় না। এমনকি আর্টলি তাদের স্বয়ংক্রিয় টিপ চাওয়ার অপশনটি বন্ধও করে দিয়েছে। তবে এগুলো ব্যতিক্রমও হতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই ‘রোবো-টিপিং’ আসলে কর্মী ও গ্রাহক উভয়ের কাছ থেকেই অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের লিহাই ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং ‘গ্র্যাচুইটি’ বইয়ের সহ-লেখক হোলোনা ওচস বলেন, আমাদের এমন বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে কিছু অসৎ মালিক রোবটের নামে পাওয়া টিপ নিজেরাই রেখে দিচ্ছেন। আসল প্রশ্ন হলো এর সুবিধাভোগী কে এবং কার পকেট কাটা যাচ্ছে?

রোবট নিচ্ছে টিপস, আসলে কি তাই?
করোনা মহামারির পর থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের দৌলতে আগের চেয়ে অনেক বেশি জায়গায় টিপ চাওয়ার চল শুরু হয়েছে। স্ক্রিনে টিপের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ভোক্তারা একে ‘আবেগীয় ব্ল্যাকমেইল’ বলে অভিযোগ করছেন। আমেরিকায় অতিরিক্ত টিপ দেওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে অনেকে কটাক্ষ করলেও এটি এখন বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়ছে। আমেরিকায় এই নিয়মের পরিবর্তন একটি সংবেদনশীল বিষয়। কারণ সেখানে টিপের সুযোগ থাকায় কোম্পানিগুলো কর্মীদের মূল বেতন কম দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭.২৫ ডলার হলেও যারা টিপ পান, তাদের ক্ষেত্রে এই মজুরি নেমে আসে ঘন্টা প্রতি মাত্র ২.১৩ ডলারে।

মার্কিন আইন অনুযায়ী কোনো কর্মীকে টিপ দিলে মালিক বা সুপারভাইজাররা তার ভাগ নিতে পারেন না। কিন্তু কোনো যন্ত্র বা রোবটকে টিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনে এক ধরনের ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। ওচস বলেন, রোবটের পাওয়া টিপের মালিকানা কার হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো আইনি মানদণ্ড তৈরি হয়নি। তিনি আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিমালার কারণে টিপ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে কর্মীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চাকরি হারানোর ভয়ে কর্মীরাও হয়তো মুখ খোলেন না। ফলে রোবটকে দেওয়া টিপ মালিকপক্ষ আত্মসাৎ করছে কি না, তা জানার স্পষ্ট কোনো উপায় এই মুহূর্তে নেই। ওচস বলেন, রান্নাঘরে বা বারের পেছনে হয়তো মানুষকেই কাজ করতে দেখা যায়, কিন্তু টিপের টাকা সরাসরি কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পকেটেও চলে যেতে পারে।

কারণ এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তবে এর মানে এই নয় যে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি সেবা খাতের কর্মীদের জন্য পুরোপুরি খারাপ। ‘টিপসি রোবট’ বা ‘আর্টলি কফি’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল আকর্ষণই রোবট। ফলে এসব যন্ত্রের পাশাপাশি কাজ করার কারণেই সেখানকার কর্মীরা এই চাকরিগুলো পেয়েছেন। আর্টলির কনটেন্ট ডিরেক্টর অ্যাবিগেল স্মাদার্স জানান, টিপ নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষের কারণেই তারা ডিজিটাল প্রম্পট বন্ধ করে কর্মীদের বেতন বাড়িয়েছেন। কিছু শাখায় এখনও টিপ দেয়ার সাধারণ বাক্স রাখা আছে, তবে টিপের শতভাগ অর্থই মানুষ কর্মীরা পান। তিনি বলেন, আমরা মানুষের ক্ষতি করে খরচ বাঁচানোর জন্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বাস করি না। স্মাদার্স জানান, সেবা খাতে কর্মীর অভাব রয়েছে এবং মানুষের বিকল্প না হয়েও রোবট এই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এমন কিছু জায়গায় এআই ব্যবহার করা হচ্ছে যেখানে এর কোনো প্রয়োজন নেই। তার মতে, প্রযুক্তির নিজস্ব কোনো দোষ নেই। এর ভালো-মন্দ নির্ভর করে উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের ওপর।

আমরা চাই এই প্রযুক্তির সুফল যেন অল্প কয়েকজনের বদলে সবার কাছে পৌঁছায়। অন্যদিকে মিসিসিপি ইউনিভার্সিটির হসপিটালিটি টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক কাতেরিনা বেরেজিনা মনে করেন, সেবা খাতকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো কেবল যে কোনো মূল্যে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছে এমনটা ভাবা অনুচিত। টিপ বা সার্ভিস ফি হয়তো রোবটের রক্ষণাবেক্ষণ বা শ্রমের খরচ চালানোর কাজেই ব্যবহার করা হয়। সেবা শিল্পে টিপ দেয়া একটি প্রচলিত নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়। তবে শ্রমিক অধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘ওয়ান ফেয়ার ওয়েজ’-এর মতো কিছু পক্ষের দাবি, রোবট ব্যবহারের আসল উদ্দেশ্য কর্মীদের কম মজুরি দেওয়া অব্যাহত রাখা। আর এই কম মজুরিই মূলত রেস্তোরাঁ খাতে কর্মী সংকটের আসল কারণ। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করছে এই নতুন প্রক্রিয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের সাড়ার ওপর।

রোবটকে কি টিপ দেওয়া উচিত?
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং ‘দ্য সাইকোলজি অব টিপিং’ বইয়ের লেখক মাইকেল লিন বলেন, মানুষ মূলত ভালো সেবার পুরস্কার হিসেবে কিংবা কর্মীদের কম মজুরির ঘাটতি পূরণে সহানুভূতিশীল হয়ে টিপ দেয়। এছাড়া সামাজিক মর্যাদা ও লোকলজ্জার বিষয়ও থাকে ‘টিপ না দিলে আমাকে খারাপ ভাববে’ এমন এক ধরনের বাধ্যবাধকতা কাজ করে। লিন আরও বলেন, রোবটের ক্ষেত্রে এসবের কোনোটিই প্রযোজ্য নয়, তাই রোবটকে টিপ দেয়ার কোনো স্পষ্ট যুক্তি নেই। তবুও অনেকে টিপ দিচ্ছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ রোবট বারটেন্ডারকে টিপ দিতে রাজি ছিলেন। তবে গবেষণার সহ-লেখক বেরেজিনা জানান, যাদের রোবট বারটেন্ডারের সেবা নেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি টিপ দিতে আগ্রহী ছিলেন।

আবার শুরুতে যারা রোবটকে টিপ দিতে চাননি, তাদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ মত বদলেছেন যখন জেনেছেন যে এই টাকা কোনো মানুষ কর্মীর কাছে যাবে। তবুও লিনের যুক্তি, রোবটকে টিপ দেয়ার বিষয়টি অত্যন্ত অজনপ্রিয় একটি চর্চা এবং সম্ভবত এটি এমনই থাকবে। বাড়তি আয়ের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো রোবট-টিপের চল শুরু করলেও এটি যদি গ্রাহকদের দূরে ঠেলে দেয়, তবে এই প্রবণতা নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, টিপ দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কেউ আপনাকে জোর করতে পারে না। নিয়ম তৈরি হয় সাধারণ মানুষের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। আমার ধারণা, ব্যবসায়ীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে এই পথ থেকে সরে আসবেন। অন্য কথায়, আমরা হয়তো ইতিহাসের একটি বিরক্তিকর ও ক্ষণস্থায়ী অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তবে পরিশেষে লিনের মন্তব্য, আমি মনে করি,Ñভবিষ্যদ্বাণী করার দাবি যে করে, সে আসলে মিথ্যে বলছে।