মার্কিন ঋণ ৪ লাখ কোটি ডলার ছাড়াল

মার্কিন ঋণ ৪ লাখ কোটি ডলার ছাড়াল

ফন্ট সাইজ:

যে যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা অমিত শক্তিধর, ধনী দেশ হিসেবে চিনি, তাদের ঋণের পরিমাণ কত জানেন! জানলে মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে। মার্কিন মুদ্রায় সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৪ লাখ কোটি ডলার। বাংলাদেশের মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ কোটি টাকা। প্রথমবারের মতো মোট সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে বুধবার জানিয়েছে দেশটির ট্রেজারি বিভাগ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়লেও কর কমানোর কারণে সরকারের রাজস্ব সেই হারে বাড়ছে না। ফলে দেশটিতে আর্থিক সংকট ঘনিয়ে আসছে বলে নতুন করে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ দৈনিক নগদ ও ঋণসংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০.০৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জনগণের হাতে থাকা ট্রেজারি সিকিউরিটির পরিমাণ ৩২.২৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে থাকা ঋণের পরিমাণ ৭.৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার।

গত এক দশকেরও কম সময়ে মার্কিন ফেডারেল সরকারের এই ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথমবার শপথ নেয়ার সময় ডনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ ছিল ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই ঋণ বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটেছে কোভিড-১৯ মহামারির সময় মাত্র দুই বছরে সরকারের ব্যাপক ঋণ নেয়ার কারণে। ডনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন মহামারি মোকাবিলায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে। বাকি ঋণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী দুই প্রেসিডেন্টের নেয়া রাজস্ব ও ব্যয়সংক্রান্ত নীতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কর আয় ও সরকারি ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা।

বাজেট পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরেই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রমের আশঙ্কা করছিল। তারা কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, আইনপ্রণেতারা যদি সরকারের বর্তমান অস্থিতিশীল আর্থিক পরিস্থিতি মোকাবিলা না করেন এবং কর বাড়ানো, সরকারি ব্যয় কমানো কিংবা উভয় পদক্ষেপ না নেন, তাহলে পূর্ণমাত্রার ঋণসংকট তৈরি হতে পারে।
নির্দলীয় কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেট-এর প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেছেন, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় থাকা কোনো সংখ্যা নয়; কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেটেও পৌঁছে যায়। ট্রেজারি বিভাগের তথ্য প্রকাশের পর এক বিবৃতিতে ম্যাকগিনিয়াস বলেছেন, আমরা যত বেশি ঋণ নেব, তত বেশি মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য অর্থের সুযোগ সংকুচিত হবে। দেশের অভ্যন্তরে জরুরি পরিস্থিতি কিংবা বিদেশে অস্থিরতার মুখে আমরা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ব।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পাঁচ মাসও পূর্ণ হওয়ার আগেই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে উঠেছে। একই সঙ্গে ২০ বছরেরও কম সময়ে ঋণের পরিমাণ চার গুণ হয়েছে। অথচ প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পেঁঁছাতে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছিল। ম্যাকগিনিয়াস আরও বলেছেন, একটি বৈশ্বিক শক্তির আর্থিক পতন কতটা অনুমানযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের অন্যতম বড় বিদেশি ক্রেতারাও হয়তো সতর্ক হয়ে উঠছে। ট্রেজারি বন্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকলেও গত এক বছরে এসব বন্ডের প্রতি তাদের চাহিদা কমেছে।

৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি নিলাম ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ সুদে সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মঙ্গলবার দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিপুল পরিমাণ মার্কিন সরকারি বন্ড বাজারে আসায় বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা দাবি করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বন্ডের দাম ও সুদের হার সাধারণত বিপরীত দিকে চলে- দাম কমলে সুদের হার বাড়ে।
বুধবার দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার কমানোর লক্ষ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। তিনি ১০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের কিছু বাইব্যাক কার্যক্রমের পরিমাণ দ্বিগুণ করে প্রতি কার্যক্রমে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার করার ঘোষণা দিয়েছেন।

দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে গেলে সাধারণত গৃহঋণ, গাড়ি ঋণ এবং ব্যবসায়িক ঋণের সুদের হারও বেড়ে যায়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পাহাড় ক্রমেই বড় হচ্ছে, কমার কোনো লক্ষণ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ডনাল্ড ট্রাম্প বুধবারও সুদের হার কমানোর জন্য তার দীর্ঘদিনের দাবির পুনরাবৃত্তি করেছেন।