মেয়াদের অর্ধেক পার হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেম। গতকাল দুপুরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। হঠাৎ তার এই পদত্যাগে নানা আলোচনা চলছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পান মোবাশ্বের মোনেম। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি কেন পদত্যাগ করলেন- এ নিয়ে পিএসসিতেও নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে দায়িত্ব নেয়ার পর পিএসসিতে বহুমুখী সংস্কারে হাত দিয়েছিলেন মোবাশ্বের মোনেম। তার বেশ কিছু উদ্যোগ সফল হয়েছে। পরীক্ষা জট কমিয়েছেন। পরীক্ষা পদ্ধতির জটিলতাও কমেছে। আগে প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও তার সময়ে এমন অভিযোগ মেলেনি। তার এই কার্যক্রমের কারণে সুবিধাবাদী মহল একের পর এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছিল বলে পিএসসি সূত্র জানিয়েছে।
বলা হচ্ছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেটের তৎপরতার কারণে কিছুদিন ধরে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার এক ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। মোবাশ্বের মোনেম পিএসসি’র পুরো স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছিলেন যা কর্মকর্তারা ভালোভাবে নেননি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পিএসসি চেয়ারম্যানের এই পদত্যাগ ভুল বার্তা দিতে পারে। এই পদত্যাগের ঘটনা সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পদত্যাগপত্রে ড. মোবাশ্বের মোনেম শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে পিএসসি কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি এতদিন নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়েছেন। দায়িত্ব পালনে কোনো সমস্যা ছিল বলে মনে হয়নি। তিনি ঠিক কী কারণে পদত্যাগ করেছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসি’র একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রধানত দু’টি কারণে তিনি সরে যাচ্ছেন। এর একটি হতে পারে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এ কারণে নির্বাচিত সরকার হয়তো তাকে রাখতে চাইছে না। নানা মহল থেকে তাকে এমন বার্তা দেয়া হয়েছে। এ কারণে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছেন। এ ছাড়াও সম্প্রতি পিএসসি থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পুরো স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবনা দিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে পিএসসি জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে টানাপড়েন তৈরি হয়। কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পিএসসি চেয়ারম্যানের প্রতি রুষ্ট ছিলেন এমন আলোচনাও আছে পিএসসিতে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন পিএসসি’র চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ড. মোবাশ্বের মোনেমকে পিএসসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
তার দায়িত্ব নেয়ার পরই বদলে যায় প্রতিষ্ঠানটির চিত্র। ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ ঘোষণা করে কার্যক্রম হাতে নেন। এর মাধ্যমে একটি বিসিএস’র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ ও নিয়োগের সুপারিশ- পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নেয়া হয়। ফলে বিসিএস পরীক্ষার দীর্ঘদিনের জট ধীরে ধীরে কমে আসছে। ৫০তম বিসিএস থেকেই এই সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছে এবং ৫১তম বিসিএস থেকে নিয়মিতভাবে একটি বিসিএসের কার্যক্রম শেষ করে পরবর্তী বিসিএস শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে চলমান বিসিএসগুলোর জট কমাতে একযোগে ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব বিসিএসে ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।
৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে দ্রুত চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগও নেয়া হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমবে, চাকরিপ্রার্থীদের বছরের পর বছর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। একই সঙ্গে পিএসসি’র প্রশাসনিক চাপ ও একাধিক বিসিএসের জটিলতা কমে পরীক্ষার আয়োজন, খাতা মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে আরও সময়বদ্ধতা, ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা আসবে। দায়িত্ব নেয়ার পর ৩/৪টি বিসিএস এবং নন-ক্যাডার পরীক্ষাসমূহের জট নিরসন করে পিএসসি’র কার্যক্রমকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনেন তিনি। এতে একদিকে যেমন চাকরিপ্রার্থীদের অসম্ভব সুবিধা হয়েছে; কর্ম কমিশন তাদের আশা ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে সরকারের ভামমূর্তিও আরও উজ্জ্বল হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান কমিশন দায়িত্বগ্রহণের আগে ব্যাপক প্রশ্নফাঁসসহ নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে পিএসসি’র ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে পৌঁছে। অল্পসময়ের মধ্যে একটি নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপনসহ এই সংক্রান্ত পুরো কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদকালে কোনো প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেনি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আসেনি। বিভিন্ন ডিজিটাইজেশন এবং অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু করার কারণে পিএসসি’র নিজস্ব সক্ষমতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
পিএসসি’র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুবিধাবাদী মহলের তৈরি প্রতিবন্ধকতার কারণেই মোবাশ্বের মোনেম সাম্প্রতিক সময়ে কাজ করতে পারছিলেন না। এ কারণে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি যে কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলেন তার ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
