দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিশন পেলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। এ ছাড়া কমিশনের দুই কমিশনারের দায়িত্ব পেয়েছেন- ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। নিয়ম অনুযায়ী গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দপ্তরে যোগদান করেছেন তারা। আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন তারা। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর নতুন করে যাত্রা শুরু হবে প্রতিষ্ঠানটির। নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কেবিনেট ডিভিশনে যোগদান করেছি। বুধবার সকালে দুদকে যাবো।’
গত সোমবার রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন কমিশন নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নতুন কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর। চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকের সমপর্যায়ের। দুই কমিশনার হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমপর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
দুদক সচিব সাইদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। সোমবার নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকার তাদের নিয়োগ দিয়েছে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ২টায় নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছেন। প্রেসিডেন্টের কাছে যোগদানের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। বুধবার থেকে তারা দুদকের কার্যালয়ে এসে দায়িত্ব গ্রহণ ও কার্যক্রম শুরু করবেন। বুধবার থেকে নতুন যাত্রা শুরু হবে দুদকের। আপনারা যে রকম প্রত্যাশা করেন, সেটা প্রত্যাশা পূরণ হবে। সকালে আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
এর আগে গত ৩রা মার্চ দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে কমিশনের শীর্ষ তিনটি পদই শূন্য ছিল। গত ২২শে জুন নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে।
দুদকে যত অভিযোগ, অনুসন্ধান থমকে আছে: দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমে আছে অসংখ্য অভিযোগ। এসব অভিযোগের অনেকগুলোর অনুসন্ধান শুরু হলেও দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি। কোথাও অনুসন্ধান থেমে আছে, আবার কোথাও তদন্তের অগ্রগতি নেই। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর পুরনো অভিযোগ ও অনুসন্ধান-তদন্ত সচল করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের একটি বড় অংশ যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। অনেক অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য অনুমোদন পেলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ফাইল পড়ে আছে কমিশনের বিভিন্ন শাখায়।
দুদকের নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর এসব পুরনো অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অভিযোগগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্তের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের পাহাড় কমাতে হলে শুধু নতুন মামলা বা অনুসন্ধান শুরু করলেই হবে না, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ফাইলগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। অনুসন্ধান ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা থাকলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন কমিশনের সামনে তাই একদিকে পুরনো অভিযোগের জট খোলা, অন্যদিকে নতুন অভিযোগ দ্রুত যাচাই ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুদকের কার্যক্রমে গতি ফেরাতে অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
নতুন কমিশনের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ: দীর্ঘ সময় কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকায় দুদকের সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অভিযোগ, অনুসন্ধান ও তদন্তে গতি ফেরানো।
একইসঙ্গে আলোচিত দুর্নীতির অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি এবং পুরনো মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রমে গতি আনা। দুদক সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলেন, দুদককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করাও নতুন কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা। অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা দেখাতে হবে। নতুন কমিশনের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো। অভিযোগ গ্রহণ থেকে অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়ের পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুদকের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও দুর্নীতি বন্ধেও কঠোর হতে হবে। বড় ধরনের অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম এবং সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া নিয়েও প্রত্যাশা রয়েছে। দেশে-বিদেশে অবৈধভাবে গড়ে তোলা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও হবে গুরুত্বপূর্ণ। দুদক কর্মকর্তাদের ধারণা, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম কয়েকটি সিদ্ধান্তের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। বিশেষ করে আলোচিত দুর্নীতির অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান-তদন্ত, অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগে কমিশন কী পদক্ষেপ নেয়- সেটিই এখন দেখার বিষয়।
