অরুণাচলে চীনের ‘গোপন দখল’, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে টহলে বাধা

আল জাজিরা এক্সপ্লেইন

অরুণাচলে চীনের ‘গোপন দখল’, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে টহলে বাধা

ফন্ট সাইজ:

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে যেতে বাধা দিচ্ছে এবং সীমান্তের জমি দখল করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর একটি তথ্য-অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চীনের কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে নীরব থাকার অভিযোগ তুলে বিরোধীরা মোদি সরকারের সমালোচনা করেছে।
নতুন অভিযোগগুলো অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম ও পাহাড়ি আপার সুবানসিরি জেলাকে ঘিরে। এই তথ্য-অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের চাপের মধ্যে নয়াদিল্লি ও বেইজিং যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এ অভিযোগ সামনে এলো। আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে।

কী পেয়েছে তথ্য-অনুসন্ধানী দল?
চীনের কথিত অনুপ্রবেশের প্রাথমিক খবরের পর অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (পিপিএ) চার সদস্যের একটি তথ্য-অনুসন্ধানী দল ওই দুর্গম এলাকায় পাঠায় বলে দলটির ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাং জানিয়েছেন।
পিপিএ ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বাধীন নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ। অরুণাচল প্রদেশেও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে।
তথ্য-অনুসন্ধানী দলটি জানায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অরুণাচলের তাকসিং এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়মিত টহল দিতে পারে না। এ সময় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, বর্ষার আগে ও বর্ষাকালের ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসের কারণে সেখানে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সময়েও চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় “সক্রিয় থাকে”। ফলে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও সীমান্ত অবকাঠামোর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেরাংয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় সেনারা শেরা-৫ নামে একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট ছেড়ে দেয়।

জেরাং আল জাজিরাকে বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পূর্বপুরুষদের শিকারক্ষেত্র হারানোয় ক্ষুব্ধ। তার দাবি, “মাটিতে গিয়ে পাওয়া অনুপ্রবেশের তথ্য অখণ্ডনীয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসব অনুপ্রবেশ নতুন বা আকস্মিক নয়; বরং কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। তার অভিযোগ, নয়াদিল্লি ও অরুণাচলের বিজেপি সরকার সীমান্তবর্তী মানুষের বিষয়টি উপেক্ষা করেছে।
গত মাসে স্থানীয় একটি উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করে যে, যতটা সম্ভব জমি দখলের উদ্দেশ্যে চীনের অনুপ্রবেশ “বহুগুণ বেড়েছে”।

ভারত ও চীন কী বলছে?
চীনা বাহিনীর কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে “ভুল এবং ভিত্তিহীন” বলে দাবি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করেনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনায় নয়াদিল্লি সবসময়ই জোর দিয়ে বলে এসেছে যে, সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি দুই দেশের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবস্থাকেও প্রভাবিত করবে।

অন্যদিকে বেইজিংও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনার অভিযোগ নিশ্চিত বা সরাসরি অস্বীকার না করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি “সাধারণভাবে স্থিতিশীল”।
তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দেশ সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা যৌথভাবে রক্ষা করার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ কোথায়?
ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল দিয়ে বিস্তৃত। জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন অংশ এই সীমান্তের অন্তর্ভুক্ত।
সীমান্তের বড় অংশই বিতর্কিত। এমনকি দুই দেশ লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) নিয়েও একমত নয়।
১৯১৪ সালে বৃটিশ ভারত ও তৎকালীন চীনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা তিব্বত সিমলা কনভেনশন স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে তথাকথিত ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারণ করা হয়।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত ম্যাকমোহন লাইনকে চীনের সঙ্গে নিজের সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে আসা চীন এই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে। বেইজিংয়ের যুক্তি, সিমলা কনভেনশনের আলোচনায় চীন অংশ নেয়নি।
চীন পুরো অরুণাচল প্রদেশের দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ বলে অভিহিত করে। অন্যদিকে, বিতর্কিত কাশ্মীরের আকসাই চিন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

লাদাখ থেকে অরুণাচল- বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বিআর দীপক বলেন, দুই দেশ এলএসি নিয়েও একই সীমারেখায় একমত হতে পারেনি।
ফলে বিভিন্ন এলাকায় দুই দেশের সীমান্ত দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে ভারত ও চীনের টহলদল একে অপরের দাবিকৃত এলাকায় ঢুকে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
লাদাখের পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক স্থানে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান ও উত্তেজনা দেখা গেছে। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের হাতাহাতির ঘটনায় অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হন।

পূর্বাঞ্চলেও উত্তেজনা রয়েছে। সিকিমের নাকু লা এলাকায় ২০২০ সালের মে মাসে এবং আবার ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ভারত ও চীনা সেনাদের সংঘর্ষ হয়।
মধ্যাঞ্চলে উত্তরাখণ্ডের বারাহোতি এবং হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে ছোটখাটো সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।
এ ছাড়া ভারত, চীন ও ভুটানের ত্রিদেশীয় সীমান্তের কাছে ডোকলাম মালভূমিতে ২০১৭ সালে চীন সামরিক সড়ক সম্প্রসারণের জন্য ভারী নির্মাণ সরঞ্জাম নিয়ে গেলে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে চীনের ৭৩ দিনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
অধ্যাপক দীপক সতর্ক করে বলেন, সীমান্তের ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যেমনটি আগে গালওয়ানে ঘটেছিল।

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা
ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দন্তি বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক ভারত ও চীনকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে বাধ্য করলেও সীমান্ত উত্তেজনার পর দুই দেশ এখনো “সতর্ক পুনঃসম্পর্ক স্থাপনের” পর্যায়ে রয়েছে।

তার মতে, চীন অতীতের মতো সীমান্ত বিরোধকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং কখনো কখনো এমন মিশ্র বার্তা দেয়, যাতে ভারত বুঝতে পারে না স্থানীয় সামরিক কমান্ডাররা নিজেদের সিদ্ধান্তে কাজ করছেন, নাকি সামরিক নেতৃত্বের নির্দেশে।

বাণিজ্য বাড়লেও সীমান্ত বিরোধ কাটেনি
সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও গত এক দশকে ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বেইজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই বাণিজ্যের বড় অংশই চীন থেকে ভারতের আমদানি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানি ছিল ৬১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতে চীনের পণ্য রপ্তানি নয়, বরং ভারতের চীনে রপ্তানি ১০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে মাত্র ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি ভারতকে এমন একটি ‘ছায়া ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্কের’ সঙ্গে যুক্ত টিয়ার-১ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে চীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক এড়িয়ে যেতে পারে বলে ওয়াশিংটনের অভিযোগ।

মুম্বাইয়ের সোমাইয়া বিদ্যাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক সাহেলি চট্টরাজ বলেন, সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতি ভারত-চীন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
তার মতে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে অন্তর্নিহিত কৌশলগত বিরোধের সমাধান হয়েছে। ভারত-চীন সম্পর্ককে প্রকৃত স্বাভাবিকীকরণের বদলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা বেশি উপযুক্ত।

প্রবীণ দন্তিও মনে করেন, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভারত ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই থাকবে। তার মতে, সীমান্ত বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই অমীমাংসিত সমস্যা দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতেই থাকবে।