ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালাতে সক্ষম শক্তিশালী ড্রোন উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়া গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছে। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া অন্তত ১০টি সামরিক ঘাঁটিতে নতুন করে ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এসব ঘাঁটি থেকে মস্কোর সবচেয়ে আধুনিক ও দীর্ঘপাল্লার ‘সুইসাইড ড্রোন’ বা বিস্ফোরকবাহী আত্মঘাতী ড্রোন উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
এরই মধ্যে কয়েকটি ঘাঁটি ইউক্রেনে হামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ইউক্রেনের সীমান্তের কাছাকাছি এসব ঘাঁটির অবস্থান থাকায় রাশিয়া কিয়েভের দুর্বল হয়ে পড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বড় আকারের আকাশ হামলা চালাতে পারছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে একই প্রযুক্তি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারে মস্কো। কিছু ঘাঁটি থেকে রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রোন পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে।
পোল্যান্ডে হামলার আশঙ্কা গোয়েন্দাদের
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, রাশিয়া পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা কিংবা ইউক্রেনের ওপর দায় চাপানো ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ হামলা বিবেচনা করতে পারে।
তবে রাশিয়া পোল্যান্ডে হামলার পরিকল্পনা করছে- এমন কোনো প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেন, জোটটি “মিত্রদেশগুলোর ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষায় প্রস্তুত” এবং ড্রোনসহ যেকোনো হুমকি প্রতিহত ও প্রতিরোধে প্রস্তুতি আরও জোরদার করবে।
সীমান্তে তৈরি হয়েছে ৫৯টি নতুন উৎক্ষেপণ রেল
ফাঁস হওয়া নথি ও স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে টেলিগ্রাফ রাশিয়ার বেলারুশ ও ইউক্রেন সীমান্তজুড়ে অন্তত ৫৯টি নতুন ড্রোন উৎক্ষেপণ রেল শনাক্ত করেছে।
এগুলো বিশেষ ধরনের যান্ত্রিক গাইড ট্র্যাক, যা প্রচলিত রানওয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ধরনের ডানাযুক্ত ড্রোন উড্ডয়নে ব্যবহার করা হয়। ড্রোনবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ড্রোনসেকের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, নতুন স্থাপিত উৎক্ষেপণ রেলের মধ্যে প্রায় ২০টি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। এর অর্থ, এগুলো রাশিয়ার সর্বশেষ দীর্ঘপাল্লার হামলাকারী ড্রোন উৎক্ষেপণে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কিছু ড্রোন ঘাঁটি পুরোনো সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক বিমানবন্দরকে নতুনভাবে ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আবার রাশিয়ার গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় নতুন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মও নির্মাণ করা হয়েছে।
ইরানি শাহেদ থেকে আরও শক্তিশালী ‘গেরান’
রাশিয়া দ্রুত ইরানি শাহেদ ড্রোনের নিজস্ব সংস্করণ উন্নত করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর নতুন উচ্চগতির জেটচালিত সংস্করণগুলো প্রায় ৬২০ মাইল (প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার) দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
এসব নতুন সংস্করণের ড্রোন শনাক্ত করা ঘাঁটিগুলো থেকে ব্যবহার করা হলে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশও রাশিয়ার হামলার আওতায় চলে আসতে পারে।
রাশিয়ার সর্বশেষ ড্রোনগুলোর মধ্যে গেরান-৪ ও গেরান-৫ রয়েছে।
ইউক্রেন সরকারের ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, এসব ড্রোন ঘণ্টায় উচ্চগতিতে উড়তে পারে এবং প্রায় ৯০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বা অন্য ধরনের পে-লোড বহন করতে সক্ষম।
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআর আরও সতর্ক করেছে যে, রাশিয়া গেরান ড্রোনে আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করছে। এগুলো কিয়েভকে রক্ষায় নিয়োজিত বিমানকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হতে পারে।
এক ঘাঁটিতে রাখা যায় ১,০০০-এর বেশি ড্রোন
স্যাটেলাইট ছবিতে রাশিয়ার নতুন ড্রোন ঘাঁটিগুলোতে অত্যাধুনিক ড্রোনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘাঁটিতে আরও উৎক্ষেপণ রেল নির্মাণাধীন রয়েছে। এতে ড্রোন হামলার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর জন্য মস্কোর পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
টেলিগ্রাফের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘাঁটিতে ড্রোন সরবরাহ করছে রাশিয়ার বিভিন্ন অস্ত্র ও গোলাবারুদ কারখানা। এর মধ্যে রয়েছে আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, যেখানে বছরে প্রায় ৬,০০০টি ড্রোন তৈরি করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণকারী ড্রোনসেকের প্রধান নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠাতা মাইক মন্নিক বলেন, ইউক্রেনে হামলা চালানোর পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে এমন হামলার ঝুঁকির মধ্যে রাখার উদ্দেশ্যে রাশিয়া তার ড্রোন নেটওয়ার্ক “উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ” করেছে।
তিনি বলেন, উৎক্ষেপণ ঘাঁটির এই সম্প্রসারণ রাশিয়াকে একদিকে আরও বেশি সংখ্যক ড্রোন একসঙ্গে উৎক্ষেপণের সক্ষমতা দিয়েছে, অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করা আরও কঠিন করে তুলেছে।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বলেন, ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের চরিত্রকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো একটি নির্ধারক উপাদানে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ন্যাটো একই সঙ্গে বড় পরিসরে ড্রোন উৎপাদন, পরিচালনা ও নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে।
টেলিগ্রাফের ওপেন-সোর্স ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত করা ১০টি ঘাঁটির মধ্যে অন্তত সাতটি সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর কিয়েভে চালানো হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে।
