‘সমঝোতা চুক্তির’ মেয়াদ শেষ, এখন কী হবে?

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

‘সমঝোতা চুক্তির’ মেয়াদ শেষ, এখন কী হবে?

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে করা সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ সোমবার (১৭ আগস্ট) শেষ হয়েছে। উভয় পক্ষই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলায়, সমঝোতাটি বাড়ানোর বিষয়ে কোনো পক্ষই আগ্রহী- এমন লক্ষণ খুব কমই দেখা যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার টেলিগ্রামে দেয়া এক পোস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে আমরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।

তবে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। আরাঘচি জানান, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌ-চলাচল পথ নির্ধারণের জন্য ইরান ও ওমান আলাদাভাবে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি সম্ভব হবে কেবল একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো গেলে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার নিউইয়র্কে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

কী ছিল সমঝোতা স্মারকে?
ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত হয় সমঝোতা স্মারকটি। পাকিস্তানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিরল উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর এটি স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো। ওই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক চলাচল, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি, মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে আলোচনার জন্য রেখে সমঝোতাটি তাৎক্ষণিকভাবে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি লেবাননে ইসরাইলের হামলা বন্ধের পথও খুঁজতে চেয়েছিল।
সমঝোতায় বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা” দেবে। পাশাপাশি একটি চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ওই চূড়ান্ত চুক্তিকে অনুমোদন করবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানোর সুযোগ রেখে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে তা সম্পন্ন করার কথা ছিল।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হতো। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ নিয়ে কাজ শুরু করার কথা ছিল ওয়াশিংটনের।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানি তেল রপ্তানির জন্য ছাড় এবং তেহরানকে জব্দ থাকা অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।

অন্যদিকে, ইরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করা এবং ৬০ দিন ধরে জাহাজগুলোকে “কোনো ধরনের ফি ছাড়াই” চলাচলের সুযোগ দেয়া।
তেহরান আরও পুনর্ব্যক্ত করেছিল যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় বসার কথাও ছিল। এসব বিষয়ের বিস্তারিত একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে উল্লেখ করার কথা ছিল, যা জাতিসংঘের সমর্থন পেত।

সমঝোতাটি কি সফল হয়েছিল?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রকাশিত সমঝোতার ভাষ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও, স্বাক্ষরের পর থেকেই মূল বিরোধ দেখা দেয় আরও মৌলিক বিষয় নিয়ে- এটি আদৌ যুদ্ধবিরতি ছিল, নাকি আরও স্থায়ী কোনো চুক্তি; এবং কোন পক্ষের কী কী দায়িত্ব ছিল।

সমঝোতাটি পুরোপুরি কার্যকর ছিল কিনা, তা নিয়েও দ্রুত বিরোধ তৈরি হয়। ২৭ জুনের মধ্যে ট্রাম্প ওই অঞ্চলে ইরানের হামলাকে সমঝোতার “বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেন।
ইরান পাল্টা দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারা লঙ্ঘন করেছে।

এনিয়ে গত ৭ জুলাই ট্রাম্প বলেন, সমঝোতা “শেষ হয়ে গেছে”। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে যায়। তেহরান যেগুলোকে বেসামরিক অবকাঠামো বলে দাবি করেছে, সেগুলোতেও হামলা হয় এবং অন্তত ৫০ জন নিহত হন।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব প্রতিশ্রুতি “লঙ্ঘন ও স্থগিত” করেছে। ফলে তেহরানও নিজেদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করেনি। এমনকি ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অর্থ দেয়ার বিষয়টিকেও ট্রাম্প উপহাস করেছেন।
বরং তিনি বলেছেন, তেহরানকে গত ৫০ বছরে নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের পাশাপাশি “রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমা ও বিভিন্ন সংঘাতে” নিহত ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টিও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র- দুই পক্ষই এখনো দাবি করে আসছে, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগন জানায়, হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র গুলি চালিয়েছে। মার্কিন দাবি, জাহাজটি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের আরোপ করা নৌ অবরোধ “লঙ্ঘন করেছে”।
তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার শর্ত মেনে না চলায় যুদ্ধবিরতি বন্ধ হয়ে যায় এবং সমঝোতা অকার্যকর হয়ে পড়ে।

তার মতে, ইরান বিশেষ করে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়েনি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি, নৌ অবরোধ তুলে নেয়নি এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার নিশ্চিত করেনি।
তিনি বলেন, এখন আনুষ্ঠানিকভাবে, কাগজে-কলমে বলা হচ্ছে যে সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে।

এখন কী হতে পারে?
সোমবার সমঝোতার মেয়াদ শেষ হলেও এর প্রকৃত অর্থ কী, তা নির্ভর করছে আপনি কোন পক্ষকে জিজ্ঞেস করছেন তার ওপর।ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি শুক্রবার বলেন, ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ছিল “যুদ্ধের অবসান, যুদ্ধবিরতি নয়”।

ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ)-কে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা লঙ্ঘন করে হামলা অব্যাহত রাখায় “বাড়ানোর মতো কোনো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিই ছিল না।”

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় সাম্প্রতিক রদবদলও ভবিষ্যৎ আলোচনায় তেহরানের আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরান সহজে ছাড় দিতে চাইবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাইকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক কার্যক্রমের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
খোশচেশমের মতে, রেজাইয়ের নিয়োগসহ সাম্প্রতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনগুলো দেখাচ্ছে যে “ইরান মনে করছে, তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।”
তার ধারণা, নতুন করে আলোচনা শুরু হলে ইরান আরও বেশি দাবি নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসবে। এসব দাবির মধ্যে গাজায় যুদ্ধের অবসান, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলে নেয়া এবং এমনকি ইসরাইলের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবিও থাকতে পারে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি এবং অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের বক্তব্য ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করার পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, ইরানকে পরাজিত করা শেষ হলে খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব। এ ছাড়া মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও শুক্রবার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে, যা “এর আগে কখনো দেখা যায়নি।”
তবে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে ট্রাম্পের হাতে খুব বেশি বিকল্প অবশিষ্ট নেই বলে মনে করেন ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেছে, কৌশলগত তেলের মজুতও ফুরিয়ে এসেছে এবং বিমানবাহী রণতরীসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম পরিকল্পিত সময়ের চেয়ে কয়েক মাস বেশি সমুদ্রে মোতায়েন রাখা হয়েছে। ফলে সামরিকভাবে নতুন করে চাপ সৃষ্টির সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সীমিত।

অর্থনৈতিক চাপের ক্ষেত্রেও ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের যাতায়াত ব্যাহত করে তারাও অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে পারে বলে জানান স্লাভিন। তিনি বলেন, ইরান এখানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা স্পষ্টতই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ তাদের দৃষ্টিতে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো যুক্তরাষ্ট্র পূরণ করেনি। তারা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর এবং ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
স্লাভিনের মতে, শেষ পর্যন্ত ইরান সম্ভবত যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ পাবে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করবে। তার ধারণা, এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তির মাধ্যমেই মিটবে- সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর, যখন ওই চুক্তির ভোটের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম থাকবে।

এদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ শনিবার তেহরানে সাংবাদিকদের বলেন, সমঝোতা স্মারকে ইরান যে ছাড়গুলো আদায় করেছে, সেগুলো “গর্ব ও বিজয়ের উৎস”।
তিনি বলেন, আমি সম্পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, সামরিক ও রাজনৈতিক- উভয় দিক থেকেই আমরা এই যুদ্ধে সত্যিকার অর্থে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছি।