শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নটি এখন আর শুধু ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় নেই। এটি একইসঙ্গে প্রত্যর্পণ আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, মানবাধিকার, মৃত্যুদণ্ড এবং কথিত ‘আন্তর্জাতিক সুরক্ষা’ এই পাঁচটি স্তরে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের বক্তব্য ভারতের আদালত অনুমোদন দেবে, নাকি ভারত সরকার নিজস্ব সিদ্ধান্তে তাকে পাঠাবে, সেটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এক অর্থে সঠিক। কিন্তু এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জুড়ে আছে: ভারত কি শেখ হাসিনাকে সত্যিই কোনো ‘আন্তর্জাতিক সুরক্ষা’ দিয়েছে? আর দিলেও সেই সুরক্ষা কি তাঁকে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধ থেকে আইনি অব্যাহতি দিতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। সর্বশেষ যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে ভারতের একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেছেন, প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভারতের আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হবে; বিষয়টি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হবে না। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিয়েছে এবং ভারত তা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করছে।
অর্থাৎ, এখনই ‘ভারত সরকার চাইলে এক আদেশে হাসিনাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতে পারে’ এমন সরল ব্যাখ্যা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ‘ভারতের আদালত ছাড়া সরকার কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারবে না’ এ কথাটিও অতিসরলীকরণ।
ভারতের Extradition Act, 1962-এর কাঠামো দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। আইনে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে; আবার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুসন্ধান ও আদালতীয় প্রক্রিয়াও রয়েছে। আইনের ১৭ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে এবং ১৮ ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে প্রত্যর্পণের ওয়ারেন্ট জারির ব্যবস্থা আছে। একই আইনের ২৯ ধারায় কেন্দ্রীয় সরকার কিছু পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া স্থগিত বা বন্ধ করতে পারে। অর্থাৎ ভারতের ব্যবস্থাটি ‘শুধু আদালত’ অথবা ‘শুধু সরকার’ কোনোটিই নয়; বরং উভয়ের আইনি ভূমিকা রয়েছে।
এখানেই ভারতীয় কর্মকর্তার বক্তব্যের তাৎপর্য। আদালত যদি প্রশ্ন তোলে—বাংলাদেশে যে অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দণ্ডিত করা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ কি না—তাহলে সেটি নিছক কূটনৈতিক প্রশ্ন থাকবে না। সেটি হবে আইনি প্রশ্ন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে ভারতীয় কর্মকর্তাও ঠিক এই বিষয়টির কথাই বলেছেন।
তবে বাংলাদেশের জন্য আশার জায়গাটিও কম নয়। ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তিতে একটি সাধারণ নীতি হলো, চুক্তির শর্ত পূরণ হলে প্রত্যর্পণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হত্যা, নরহত্যা, গুরুতর হামলা, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, অপহরণ, হত্যায় প্ররোচনা এবং সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট কিছু অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
তাই ‘এটি রাজনৈতিক মামলা, অতএব প্রত্যর্পণ হবে না’—এমন যুক্তি নিজে থেকেই চূড়ান্ত নয়। অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ, বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ ভারতের আইনে কীভাবে সংজ্ঞায়িত, সবই বিবেচনায় আসবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন মৃত্যুদণ্ড। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে, এই তথ্য প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়াকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভারতের প্রত্যর্পণ আইনে মৃত্যুদণ্ড-সম্পর্কিত একটি বিশেষ বিধান রয়েছে। আইনের ৩৪সি ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে জীবন কারাদণ্ডের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে, যখন সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের আইনে সেই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড নেই।
এর অর্থ এই নয় যে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারত অবশ্যই মৃত্যুদণ্ডের নিশ্চয়তা চাইবে বা প্রত্যর্পণ মানেই মৃত্যুদণ্ড বাতিল করতে হবে। বরং এটি দেখায়, প্রত্যর্পণের পর কী ধরনের শাস্তি কার্যকর হবে, সেটিও আইনি বিবেচনার অংশ হতে পারে। সুতরাং ঢাকার জন্য কেবল ‘দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফেরত দিন’ বলাই যথেষ্ট নয়; দিল্লির আদালত ও সরকার যে মানবাধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন তুলতে পারে, তারও আইনসম্মত উত্তর প্রস্তুত রাখা দরকার।
এবার আসি সবচেয়ে আলোচিত ‘আন্তর্জাতিক সুরক্ষা’ প্রসঙ্গে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের নিরাপত্তা বা আশ্রয়ের আওতায় থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটিকে সরাসরি ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন-এর অধীনে স্বীকৃত শরণার্থী মর্যাদা বলে ধরে নেওয়া যাবে না। কারণ ভারত ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন বা ১৯৬৭ প্রোটকলের-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র নয় এবং দেশটির কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় রিফিউজি আইনও নেই।
এখানেই ‘আন্তর্জাতিক সুরক্ষা’ ও ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ শব্দ দুটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
কোনো রাষ্ট্র একজন বিদেশি নাগরিককে রাজনৈতিক বা মানবিক কারণে নিজের ভূখণ্ডে থাকতে দিতে পারে। তাকে নিরাপত্তা দিতে পারে। কিন্তু সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের অধীনে refugee status তৈরি করে না। একইভাবে, কোনো ব্যক্তিকে কোনো রাষ্ট্রে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া মানেই প্রত্যর্পণ থেকে স্থায়ী আইনি immunity পাওয়া নয়।
তবে এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। ১৯৫১ সালের কনভেনশন-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো non-refoulement—কোনো শরণার্থীকে এমন দেশে ফেরত না পাঠানো, যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা গুরুতরভাবে বিপন্ন হতে পারে। ইউএনএইচসিআর বলছে, এই নীতিটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শরণার্থী আইনের একটি মৌলিক নীতি এবং এর প্রভাব নির্যাতন, নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকির ক্ষেত্রেও বিবেচ্য। এমনকি কোনো রাষ্ট্র কনভেনশন-এর পক্ষভুক্ত না হলেও non-refoulement নীতির একটি customary international law ভিত্তি রয়েছে বলে ইউএনএইচসিআর ব্যাখ্যা করে।
কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা আছে। Refugee Convention নিজেই যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গুরুতর অরাজনৈতিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে refugee protection-এর exclusion clause রেখেছে।
তাই শেখ হাসিনা ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ পেয়েছেন কি না? এটি এক প্রশ্ন; আর তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ও মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যর্পণযোগ্যতার ওপর কী প্রভাব ফেলবে—এটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।
এই জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থানও সতর্ক হওয়া দরকার। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ভারতীয় আদালত অনুমোদন নেবে নাকি সরকার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তাঁকে পাঠাবে, সেটি ভারতের বিষয়। এই বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে সংযত। কারণ বাংলাদেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়াকে নির্দেশ দিতে পারে না। বাংলাদেশের কাজ হলো চুক্তি অনুযায়ী শক্তিশালী, পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত আইনি নথি উপস্থাপন করা।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারতের আদালতে প্রশ্ন উঠবে শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কি না, তা নিয়ে নয়; বিচারটি কতটা ন্যায়সংগত ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছেন কি না, রায়টি অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে কি না, এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি কতটা বাস্তব—এসব বিষয়ও প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
আর এখানেই রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে আইনি প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ যদি মনে করে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত আনা প্রয়োজন, তাহলে দিল্লির কাছে শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়, আইনি যুক্তির পূর্ণ প্যাকেজ দিতে হবে। কেন অভিযোগগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা নয়, কেন সেগুলো প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ, বিচারপ্রক্রিয়ায় কী কী সেফগার্ড ছিল, মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান কী এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির কোন কোন ধারায় ভারতের আপত্তির জবাব পাওয়া যায়, সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
অন্যদিকে ভারতের জন্যও বিষয়টি সহজ নয়। একদিকে দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি, অন্যদিকে ভারতের নিজস্ব আইন, বিচারিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, সবকিছুর ভারসাম্য রাখতে হবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে ‘অনুকূল পরিবেশ’-এর যে দাবি উঠেছে, তাতে বোঝা যায় হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-ও বলছে, প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি বর্তমান ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে আলাদা করে দেখা কঠিন।
শেষ কথা হলো, শেখ হাসিনা ভারতে আছেন মানেই তিনি আন্তর্জাতিক আইনের এমন কোনো অদৃশ্য ঢাল পেয়েছেন, যার কারণে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো অসম্ভব! এ ধারণা ঠিক নয়। আবার বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে মানেই ভারত সরকার তাঁকে কালই তুলে দিতে বাধ্য! এ ধারণাও ঠিক নয়। বাস্তবতা মাঝখানে।
ভারতের হাতে রয়েছে সরকার, প্রশাসন ও আদালতের সমন্বিত আইনি কাঠামো। বাংলাদেশের হাতে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং তার আওতায় উপস্থাপন করার মতো বিচারিক নথি। আর শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রতিরক্ষার জায়গায় থাকবে রাজনৈতিক অপরাধের দাবি, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি, মানবাধিকার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন।
সুতরাং এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় ‘কে কাকে রাজনৈতিকভাবে চাপ দিল’ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-অনুরোধ ভারতের আদালতের আইনি পরীক্ষায় কতটা টিকবে?
সেই পরীক্ষার উত্তর কূটনৈতিক মঞ্চে নয়, শেষ পর্যন্ত আইনের ভাষাতেই লেখা হবে।
আর যদি দিল্লি সত্যিই আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে ঢাকারও আবেগ নয়, প্রমাণ, আইন ও যুক্তির ওপরই নির্ভর করা উচিত। কারণ শেখ হাসিনাকে ফেরানোর লড়াই এখন যতটা রাজনৈতিক, তার চেয়ে কম নয় আইনি। আর সেই আইনি লড়াইয়ে সবচেয়ে দুর্বল অস্ত্র হলো স্লোগান; সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো চুক্তির ধারা, আদালতের নথি এবং ন্যায়বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
