অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ দলকে দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজ খেলতে ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রায় দুই যুগ অজি ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশকে কোনো টেস্ট ম্যাচ খেলতে আমন্ত্রণ জানায়নি। ‘ছোট দল’ হওয়ায় সিরিজ আয়োজনে আর্থিক ক্ষতি হবে, অজিরা মুখে এমনটা না বললেও আসল কারণ সবার জানা ছিল। কিন্তু এত লম্বা সময় পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারিয়ে যেন দম্ভ গুঁড়িয়ে দিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক বলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় খেলাটা হবে সম্মান নিয়ে দেশে ফিরে আসার লড়াই। প্রথম টেস্টেই ডারউইনে চারদিনে ব্যাট ও বলের শক্ত লড়াইয়ে জয় তুলে নিয়েছে তারা। ম্যাচ শেষ হতেই ধারাভাষ্যকার চেয়েচি বলেন, কনগ্র্যাচুলেশন বাংলাদেশ, ঐতিহাসিক জয়। তৃতীয় দিন সন্ধ্যা থেকেই ডারউইনের বাতাসে বইছিল টাইগারদের বিজয়ের সুবাস। গতকাল চতুর্থ দিন মধ্যাহ্ন বিরতির পরই ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে কলার উঁচিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। ম্যাচ জয়ের পর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে টাইগার অধিনায়ক বলেন, ‘তিনটি ফরম্যাট মিলিয়ে আমাদের অনেক স্মরণীয় সাফল্য থাকলেও এটি দেশের ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং পুরো চারদিনই দল পরিকল্পনা মেনে খুব ভালো ক্রিকেট খেলার চেষ্টা ধরে রেখেছিল।’
প্রথম ইনিংসে বল হাতে শুরুতেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেন পেসার হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্টিভ স্মিথ ৭১ রান করলেও হাসানের ছয় উইকেটের তোপে স্বাগতিকদের ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ১৯৮ রানে। ইনজুরির কারণে মূল একাদশে নাহিদ রানা না থাকলেও বোলিং বিভাগের শক্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে দল। প্রস্তুতি ম্যাচে দল ৫৪ রানে অলআউট হলেও মূল টেস্টে ঘুরে দাঁড়ায় ব্যাটাররা। দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম তুলে নেন সেঞ্চুরি। খেলেন ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। অধিনায়ক শান্ত করেন ৮৪ রান আর অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ উপহার দেন ৬৫ রান। শেষদিকে সাদমানের ২০ রান ছাড়াও তাইজুল, তাসকিন ও এবাদতের দৃঢ়তায় বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করে ৪২৬ রান। প্রতিপক্ষের জশ হ্যাজলউড ছয় উইকেট শিকার করলেও সফরকারীরা পায় ২২৮ রানের লিড। সমন্বিত দলীয় প্রচেষ্টা নিয়ে শান্ত বলেন, ‘আমার কাছে পুরো বাংলাদেশ দলই ম্যাচের সেরা। কারণ প্রত্যেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে।
তামিমের প্রথম সেঞ্চুরি বিশেষ প্রাপ্তি এবং মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স ছিল অনন্য। পাশাপাশি হাসান, তাইজুল ও তাসকিনের মতো লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের রান আমাদের বড় লিড এনে দিতে সাহায্য করেছিল।’ দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে চার নম্বর দিন সকাল থেকেই বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা। অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিন ২০১ বলে ১০৪ রানের একক লড়াই চালালেও মিরাজের স্পিন ঘূর্ণিতে ভেঙে পড়ে তাদের ব্যাটিং লাইনআপ। অ্যালেক্স ক্যারি, বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নকে ফিরিয়ে ৬৬ রানে পাঁচ উইকেট নেন তিনি। এটি বিদেশে তার চতুর্থ এবং টেস্টে ১৫তম পাঁচ উইকেট শিকারের মাইলফলক। গ্রিনকে হাসান মাহমুদ বোল্ড করলে এবং তাসকিন আহমেদ মিচেল স্টার্ককে ফেরালে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে অলআউট হয়। ম্যাচে হাসান নেন মোট ৯ উইকেট। এতে মাত্র ৫৭ রানের মামুলি লক্ষ্য দিতে সক্ষম হয় অজিরা। কঠিন কন্ডিশন মোকাবিলা প্রসঙ্গে শান্ত বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং ও ব্যাটিং আক্রমণের বিরুদ্ধে খেলাটা আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা নেতিবাচক চিন্তা না করে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ উপভোগ করার চেষ্টা করেছি এবং খেলোয়াড়রা সবাই পুরো চারদিন মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিয়ে লড়াই করেছে।’
৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ দল শুরুতেই জশ হ্যাজলউডের বলে তানজিদ তামিম আউট হলেও কোনো বিপদে পড়েনি দল। অভিজ্ঞ সাদমান ইসলাম অপরাজিত ২৫ রান এবং তিন নম্বরে নামা মুমিনুল হক অপরাজিত ৩০ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। বো ওয়েবস্টারের বলে বাউন্ডারি মেরে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে মুমিনুল দলের জয় নিশ্চিত করেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় এবং ২০১৭ এর পর অজিদের বিপক্ষে মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট জয়। গ্যালারিতে উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের চিৎকারে মাঠ মুখরিত হয় এবং খেলোয়াড়রা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে উদ্যাপনে মাতেন। এই অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবাল ফোন করে দলকে সরাসরি অভিনন্দন জানান। এ জয়ের পর টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে টাইগার অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা পয়েন্ট টেবিলের তিন নম্বর পজিশনে। তবে ফাইনাল নিয়ে এখনই খুব দূরে চিন্তা করতে চাই না। মাটিতে পা রেখে আমাদের ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে হবে এবং পরের টেস্টেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভালো খেলে সিরিজ শেষ করাই আমাদের মূল ও প্রধান লক্ষ্য।’
