প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন। আমরা বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করলে, যেই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে, আমরা সেই কাজগুলো করতে চাই। সে কারণেই আমরা খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ অভিযান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্কুলের বাচ্চাদের পোশাক, নতুন বই দেয়া, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার মতো কাজগুলো করতে চাই।
গতকাল কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল- বিএনপিকে আপনারা জয়যুক্ত করেছিলেন। কারণ বিএনপি’র রাজনীতিটাই হচ্ছে এমন একটা রাজনীতি- যেই রাজনীতির বাস্তবায়ন করলে দেশের মানুষ উপকৃত হবে, গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে, এটাই হচ্ছে বিএনপি’র রাজনীতি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপিকে জনগণ যতবার দেশ পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছে, দেশের দায়িত্ব যতবার অর্পণ করেছে, আমরা দেখেছি কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক দল বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। তারেক রহমান উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যে পরিকল্পনার কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম, এই মাছের অবমুক্তকরণ, এই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বাচ্চাদেরকে মানুষরূপে গড়ে তোলা সুন্দর নাগরিক হিসেবে, ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেবদেরকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, এইগুলো যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে? জনতা তখন সমস্বরে জবাব দেন- হ্যাঁ। তারেক রহমান পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে কি গ্রামের মানুষের পানির চাহিদা ও সেচের সুবিধা বাস্তবায়িত হবে? আবারো জনতার পক্ষ থেকে জবাব আসে- হ্যাঁ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এসব কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে, যারা রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, যারা দেশের মানুষকে মিথ্যে কথা বলে বিভ্রান্তি তৈরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে আপনাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা জানি, আমরা দেখেছি, দেখছি এখনো, যে স্বৈরাচার এ দেশ থেকে পালিয়ে গেছে, যারা মানুষের কথা বলার অধিকারকে গলা টিপে মারতে চেয়েছিল, যারা মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনকে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে এই মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং তাদেরকে এই দেশ থেকে তারা বিতাড়িত করে দিয়েছে।
তারেক রহমান যোগ করেন, এখন সময় হচ্ছে কাজ করার। এখন সময় হচ্ছে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। দেশকে যদি আমরা সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারি তাহলে এই দেশের মানুষকে কষ্ট করে থাকতে হবে। আমরা দেখেছি বিগত দিনে কীভাবে এই দেশের মানুষের অর্থসম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছিল। সেই পাচারকারীদেরকে এই দেশের মানুষ বিতাড়িত করে দিয়েছে, এই দেশ থেকে। সেইজন্য এখন সময় হচ্ছে আমাদের সকলকে হাতে হাত রেখে কাজ শুরু করার। রাষ্ট্র মেরামতের কাজ শুরু করতে হবে। দেশ পুনর্গঠনের কাজ আমাদেরকে করতে হবে। কারণ দেশের মালিক জনগণ। তিনি বলেন, এই দেশকে যদি গড়ে তুলতে হয়, তাহলে জনগণকেই সামনে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে যদি সমুন্নত রাখতে হয়, তাহলে জনগণকে যেই ছাত্র-জনতা ’২৪-এর ৫ই আগস্ট রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছিল, সেই জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। যারা দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলবে, যারা মানুষের জন্য নেয়া বাস্তব পদক্ষেপগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি, একদিনে সকল সমস্যার সমাধান হবে না। যেভাবে স্বৈরাচার এ দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্র নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাসহ প্রত্যেকটি ব্যবস্থাকে ধ্বংসপ্রাপ্ত করে দিয়ে গিয়েছিল, আমরা সরকার গঠন করার পরে ধ্বংসপ্রাপ্ত সে সবকিছুকে তুলতে হচ্ছে। এই যে এখানকার ব্রিজ, রাস্তার কথা এমপি সাহেব বললেন, যদি দেশের উন্নয়নই হতো, তাহলে এই কাজগুলো এত বছরেও হলো না কেন? এই জন্যই হয় নাই, কারণ এর আগে যারা দেশের শাসনভার দখল করে নিয়ে রেখেছিল, তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিল না। তারা জোর করে ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল এবং সেজনই তারা জনগণের জন্য কোনো কাজ করে নাই।
বিদ্যুতের সমস্যার জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেখেছি, আমি জানি, সমগ্র দেশের মানুষ শুধু ঢাকা শহর না, ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের সকল মানুষ, জেলা-উপজেলার বহু মানুষ বিদ্যুতের কষ্ট ভোগ করছেন এই মুহূর্তে। কিন্তু এই যে বিদ্যুতের সমস্যা, এই সমস্যা যে স্বৈরাচারকে এদেশের মানুষ বিতাড়িত করেছে, তাদের অপরিকল্পিত পরিকল্পনার জন্য, অপরিকল্পিত বিভিন্ন পদক্ষেপের জন্য আজকে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির এই অবস্থা। আপনারা যেহেতু বিএনপিকে নির্বাচিত করেছেন, বিএনপি দেশের মানুষের দল। বিএনপি এ দেশের স্বার্থেই কাজ করবে। আগামী ২৭ তারিখে আবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। সেই জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আপনাদের দল, আপনাদের সরকার, দেশের মানুষের সামনে জাতীয় সংসদের মধ্যে উপস্থাপন করবে- কীভাবে আমরা ইনশাআল্লাহ আগামী ১০ বছরের জন্য এই দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবো। সেই পরিকল্পনা আমরা দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করবো। তিনি বলেন, আমরা দেখছি, এই সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি রাস্তায়-রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। রাজপথে যদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়- সাধারণ জনগণ। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের চাকরি-বাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু উপকৃত হয় সেই সকল বিশৃঙ্খলাকারী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যে সমর্থন দিয়েছিলেন ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে, সেই সমর্থনের উপরে আপনারা আস্থা ধরে রাখুন। ইনশাআল্লাহ আপনাদের নির্বাচিত দল জনগণের জন্য অতীতেও কাজ করেছে, বর্তমানেও কাজ করবে এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করবে না। আসুন আজকে আমরা সকলেই শপথ গ্রহণ করি, সকলে প্রতিজ্ঞা করি, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা কাজ করবে, যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, যারা জনগণের স্বার্থে নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করবে, তাদেরকে জনগণ, জনগণের সকল শক্তি নিয়ে প্রতিরোধ করবে। যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে দেশের শান্তি রক্ষা করতে হবে। দেশের মানুষ এখন শান্তি চায়। দেশের মানুষ এখন শৃঙ্খলা চায়। আইনের শাসন চায়। দেশের মানুষ কর্মসংস্থান চায়। দেশের মানুষ তার সন্তানদের জন্য শিক্ষা চায়। দেশের মানুষ তার পরিবারের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চায়। এই কাজগুলো যদি করতে হয়, আমাদেরকে ধৈর্যসহকারে অবস্থান নিতে হবে, ধৈর্যসহকারে আমাদেরকে ধীরে ধীরে সময়ের জন্য সুযোগ দিতে হবে। একইসঙ্গে যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে, তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন বক্তব্য রাখেন। এ সময় কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমান এবং পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ঢাকা থেকে সড়কপথে রওনা দিয়ে সকাল ১১টা ২৪ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পৌঁছান। মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণের মধ্যদিয়ে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-এর আনুষ্ঠানিকতা তিনি শুরু করেন। এরপর তিনি কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা এলাকায় কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদ্বোধন ও জাতীয় মৎস্য পদক ২০২৬ প্রদান করেন। বিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জেলা সদরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ফ্যামিল কার্ড বিতরণ, মেধাবী শিক্ষার্থী, অসুস্থ, দুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুদান এবং মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যক্তিবর্গের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের সম্মানী প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ৪৩২ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, ৫টি মন্দিরের ১০ জন পুরোহিত এবং একটি গির্জার ২ জন যাজকসহ মোট ৪৪৪ জনকে সম্মানী প্রদানের মাধ্যমে তিনি এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। এ ছাড়া তিনি ল্যাপটপের বাটন প্রেস করে প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া অনুদান পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থী জ্যোতি রাণী দাস, অনুষ্ঠানমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চাকরির নিয়োগপত্র পাওয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী আনিসুর রহমান, ইমাম আমান উল্লাহ, পুরোহিত দীপেন্দ্র চক্রবর্তী, সেভেস্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের যাজক উইথ ক্লেব রঙ অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাওরে উড়াল সেতু বাস্তবায়নের দাবি জানান।
মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম এবং সমাজকল্যাণ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। পুরাতন স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠান শেষ করে প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে যান। সেখানে তিনি শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন এবং জেলা ছাত্রদলের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
