গত এক মাসে সিলেটে আড়াইশ’ কোটি টাকার নির্মাণকাজের বরাদ্দ এসেছে। কিন্তু এতে অংশ নিয়েও সিলেটের ঠিকাদার কাজ পাননি। কৌশলে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বাইরের ঠিকাদাররা। প্রকল্পের নাম- ‘গ্রামীণ রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্প।’ কর্মকর্তাদের দাবি; সিলেটের ঠিকাদারদের যোগ্যতা না থাকায় কাজ পাননি। কিন্তু ঠিকাদাররা এটি মানতে নারাজ। তাদের মতে; প্রায় চার বছর ধরে এলজিইডিতে ‘থিতু’ হয়ে থাকা সহকারী প্রকৌশলী হাসান শোভনের
কারণেই সিলেটের ঠিকাদাররা কাজ পাচ্ছেন না। বাইরের ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই এই কাজ বাগিয়ে নেয়া হয়েছে। এতে করে আগামী ৬ মাস পর সিলেটের ঠিকাদাররা কাজহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে হবে আশঙ্কা করেন তারা। সিলেট এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হাসান শোভন একটি পরিচিত নাম। সাড়ে ৩ বছর ধরে তিনি এলজিইডিতে দাপটের সঙ্গে চাকরি করে যাচ্ছে।
সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একতরফা আধিপত্য খাটিয়েছেন। তখন তার সঙ্গে একাংশের ঠিকাদারদের যোগসূত্র ছিল। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে সময়ে সিলেটে দুটি মামলার আসামি হন শোভন। পরবর্তীতে শোভন ওই মামলাগুলোকে রফাদফা করে ফেলেন। যোগদানের পর থেকে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা লুটপাট চক্র এখনো বহাল। যেসব কর্মকর্তা সিলেটে বদলি হয়ে এসেছেন তারাও তার সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত। অভিযোগ উঠেছে; বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খানও তার সিন্ডিকেটের সদস্য। মামুনকে এরই মধ্যে দু’দফা সিলেট থেকে বদলির আদেশ দেয়া হলেও পরবর্তীতে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঠিকাদাররা জানিয়েছেন- গ্রামীণ রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অধীনে গত এক মাসে সিলেট জেলায় প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার কাজের বরাদ্দ এসেছে।
এই প্রকল্পের অধীনে ১৫টি গ্রুপে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সব কাজই পেয়েছেন সিলেট অঞ্চলের বাইরের ঠিকাদাররা। এতে সিলেটের কয়েকজন ঠিকাদার অংশ নিলেও কেউ কাজ পাননি। এতে ক্ষুব্ধ হন ঠিকাদাররা। তারা অভিযোগ করেন- শোভন সিলেট এলজিইডিতে ‘মি. পার্সেন্টিজ’ হিসেবে পরিচিত। কোনো কাজে ৩ অথবা ৪ ভাগ পার্সেন্টিজ না দিলে কাজ পাওয়া যায় না। শোভন স্কিম তৈরি, টেন্ডার ও ঠিকাদার মনোনীত সবই করেন। তার সঙ্গে পার্সেন্টিজ নিয়ে যাদের কথাবার্তায় চূড়ান্ত হয়েছেন তারাই কাজ পেয়েছেন। তারা বলেন- সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ একটি রোড হচ্ছে বোরহান উদ্দিন সড়ক। সাবেক মন্ত্রী ও এমপি নাহিদের ওই সড়কে ফ্ল্যাশফ্যাড প্রকল্পের ১৭ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার হয়েছে। বাইরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ’র করপোরেশন ওই কাজ নিলেও মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ৩০ শতাংশ কাজই শেষ হয়নি। এরই মধ্যে প্রায় ৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে নিয়ে গেছে ঠিকাদার পক্ষ।
গোয়াইনঘাটে গুরুত্বপূর্ণ মাতুরতল সড়কের অবস্থাও একই। পার্সেন্টিজের বিনিময়ে শোভন ওইসব কাজ বাইরের ঠিকাদার পক্ষকে পাইয়ে দিয়েছিল। এবারের আড়াইশ’ কোটি টাকা কাজে টেন্ডার গোপনে বাইরে ঠিকাদারদের দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে শোভন ও এলজিইডি’র ঠিকাদার চক্র ৩ পার্সেন্ট করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। বিষয়টি নিয়ে প্রায় ২০ দিন আগে সিলেট এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঠিকাদাররা। তারা সহকারী প্রকৌশলী হাসান শোভনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে তাকে গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ করেন। জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী তাদের আশ্বস্ত করলেও হাসান শোভন এখনো নিজ কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তবে তিনি নির্ধারিত সময়ে অফিসে যান না বলে জানিয়েছেন ঠিকাদাররা। তারা জানান- তার কার্যালয় থেকে নেইম প্লেট সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর তিনি অফিসে যান। বাইরে থেকে আসা ঠিকাদারদের নিয়ে সিলেটে কয়েকটি ত্রি-স্টার রেস্টুরেন্টে নিয়মিত ব্যবসায়িক ডিল করেন।
সিলেট এলজিইডি’র ঠিকাদার এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদুল হোসেন তোফা জানিয়েছেন- গ্রামীণ রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পে হরিলুট চালাতে সিলেটে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা বাইরের ঠিকাদারদের দিয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী শোভন হাসান। এখন তিনি ওই প্রকল্পের ঢাকার কর্মকর্তা হতে লবিং চালাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি যদি এ প্রকল্পে থাকেন তাহলে গোটা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি বাণিজ্যে মেতে উঠবেন। আমরা চাই তাকে দ্রুত সিলেট থেকে সরিয়ে নেয়া হোক। এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম জানান- বাইরের ঠিকাদাররা কাজ পেলে সিলেটের উন্নয়নে আন্তরিকতা কম থাকে। এতে কাজও ধীরগতি হয়। বিলম্বের কারণে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। ঠিকাদার শুভ্রত ভৌমিক চন্দন জানিয়েছেন- শোভনের সিন্ডিকেটের কারণে অনেক ঠিকাদার অতিষ্ঠ। তিনি নিজেও এখন সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়। ঠিকাদারদের অভিযোগ দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সিলেট এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খান। তিনি জানিয়েছেন- অফিসে লোকবল কম থাকায় সহকারী প্রকৌশলী শোভনকে এখনো রাখা হয়েছে। আগামী মাস থেকে তাকে অন্যত্র বদলি করা হবে।
তবে কাজ পাইয়ে দেয়া ও পার্সেন্টিজ নেয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন- সিলেটের ঠিকাদাররা বড় প্রকল্পের কাজের জন্য এখনো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। এ কারণে বাইরে ঠিকাদাররা কাজ নিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে সহকারী প্রকৌশলী হাসান শোভনের সরকারীর মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি নিজেকে শোভন নয় বলে দাবি করেন। ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দিলে ব্যস্ত থাকার অজুহাত দেখিয়ে কল কেটে দেন।
