কয়েক মাস ধরে দখলীকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা তাণ্ডব চালিয়ে আসছে। কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না তাদের। এ জন্যই তারা ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে হামলা চালাচ্ছে। নাবলুসের দক্ষিণে অবস্থিত কুসরা গ্রামে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত রোববার থেকে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা সেখানে তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এমনকি এই ঘটনায় ইসরাইলি সরকার বিরলভাবে বসতি স্থাপনকারীদের আচরণের নিন্দা জানিয়েছে। সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মার্সার বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
তবে বিশ্লেষক, অধিকারকর্মী এবং ইসরাইলি পার্লামেন্টের সদস্যরা সরকারের এই বক্তব্যে বিস্ময় ও অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, ইসরাইলি সেনাবাহিনীই যেখানে কুসরায় বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ থামাতে পারছে না, সেখানে সরকারের দায় অস্বীকারের চেষ্টা বিশ্বাসযোগ্য নয়। অবরোধের সময় বসতি স্থাপনকারীরা কুসরার ওই তিন পরিবারের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এমনকি শুরুতে ইসরাইলি সেনাদের বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে মিশতে এবং তাদের সঙ্গে প্রার্থনা করতেও দেখা গেছে। ইসরাইলি পার্লামেন্টের বামপন্থী হাদাশ পার্টির সদস্য আইদা তুমা-স্লেইমান বলেন, সহিংসতা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার সরকারি প্রচেষ্টা হাস্যকর। তিনি বলেন, তারা যা খুশি বলতে পারে, কিন্তু তারা এর সঙ্গে জড়িত। তার মতে, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে- এখন ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে পার্থক্য করাই কঠিন।
তুমা-স্লেইমান বলেন, অনেক বসতি স্থাপনকারীকে তাদের নিজেদের অবৈধ বসতি রক্ষার দায়িত্ব পালন করেই সামরিক সেবা সম্পন্ন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে এবং অস্ত্র দিচ্ছে। সরকার তাদের বিরোধী নয়। তাদের সমর্থন করাই সরকারি নীতি।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন বিতসেলেম-এর ইয়াইর ডভির বলেন, কুসরায় যা ঘটছে, তা নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, আমরা কয়েক দশক ধরে এটি দেখে আসছি। সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা শুরু হলে সরকার তার নিন্দা করে, বসতি স্থাপনকারীরা সরে যায় এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেলেই তারা আবার ফিরে আসে। ডভির আরও বলেন, পরিষ্কার করে বলা দরকার, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। দুটির লক্ষ্য একই। তাহলো ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা এবং তাদের জমি দখল করা।
আন্তর্জাতিক আইন এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায় অগ্রাহ্য করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্ব আরও দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দপ্তরের (ওসিএইচএ) পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলের অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও তত বাড়ছে।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এবং “ইসরাইল’স অকুপেশন” বইয়ের লেখক নেভ গর্ডন বলেছেন, দখলকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজার মতো অন্যান্য এলাকায় নির্বাচনের আগে সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই দখলকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজার মতো অন্যান্য এলাকায় সহিংসতা বাড়তে দেখছি। বসতি স্থাপনকারী ও ইসরাইলি উগ্র ডানপন্থীদের মধ্যে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে নেতানিয়াহুর জোটে তাদের অনেক সহযোগী হয়তো নির্বাচনের পর ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন। এ কারণে নির্বাচনকে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা ও তাগিদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গর্ডনের ভাষায়, ভোটটি পুরো বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর জন্য যেন একটি আহ্বান- তারা যতদিন সুযোগ পাচ্ছে, ততদিন যতটা সম্ভব কাজ করে নিতে হবে।
ইসরাইলি সরকার বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার জন্য খুব সামান্যই করেছে। বরং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির প্রভাবশালী সদস্যরা উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন বসতি সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এসব সম্মেলনের কিছুতে গাজা থেকে জাতিগত নির্মূলের বিষয়টিও সরাসরি আলোচিত হয়েছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি গ্রাম তাল-এ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর পর জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছিল, পুরো পশ্চিম তীর ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেই ঘটনার পর নেতানিয়াহু আরও অবৈধ বসতি স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
