খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে দেশটির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ খবর দিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক কিমবারলি হলকেট। ওদিকে, ট্রাম্পের এই হুমকির তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ইরানেরই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র পরাজয় মেনে না নেয়া পর্যন্ত সেখানে অবরোধ কার্যকর থাকবে।
ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়েও নতুন করে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেন, ইসলামাবাদে যে সমঝোতা হয়েছিল সেটা ‘যুদ্ধের সমাপ্তি’ নির্দেশ করেছিল, ‘যুদ্ধবিরতি’ নয়। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি লঙ্ঘন করার পর আবারও যুদ্ধ শুরু হয়। ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও হোয়াইট হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতির সাবেক উপদেষ্টা মার্ক গিন্সবার্গ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অভিযান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে পারে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশল মূলত ‘অর্থনৈতিক মুরগির লড়াই’- দুই পক্ষের মধ্যে কে আগে পিছিয়ে যায়, সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন। তার মতে, পরিস্থিতি এবার আগের চেয়ে আলাদা। কারণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে এবং ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকেও দেশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে গিন্সবার্গের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই। তিনি বলেন, এই প্রশাসনের কোনো শেষ লক্ষ্য কী, সেটাই স্পষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট কী করার পরিকল্পনা করছেন, আমরা জানি না।
তার মতে, এখন পর্যন্ত শুধু বোঝা যাচ্ছে যে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘস্থায়ী চাপ দেয়ার কৌশল ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানকে সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়া দুটি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করে গিন্সবার্গ বলেন, শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের আগে কে রাস্তা থেকে সরে যাবে- সেটিই প্রশ্ন। তার ধারণা, শেষ পর্যন্ত ইরান সরকারের আগে ট্রাম্প প্রশাসনই নতি স্বীকার করতে পারে।
স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্র্যাজিয়ারের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপের হুমকি দিচ্ছে, তেহরান সম্ভবত তা প্রতিরোধ করতে পারবে। গ্র্যাজিয়ার বলেন, ইরানিরা সম্ভবত এটি প্রতিরোধ করতে পারবে। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইরান একটি ‘বহিষ্কৃত রাষ্ট্র’ এবং কয়েক দশক ধরে দেশটি নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। তাই ছয় মাসের সামরিক হামলা যে ফল আনতে পারেনি, এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধ তা এনে দেবে- ট্রাম্প প্রশাসনের এমন ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গ্র্যাজিয়ারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দীর্ঘপাল্লার গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার কারণেও ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপের দিকে বেশি ঝুঁকছে। সাবেক মেরিন করপস কর্মকর্তা গ্র্যাজিয়ার বলেন, বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনিক বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিদ্যমান তথ্য থেকে মনে হচ্ছে, দূরপাল্লার সামরিক অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রের ঘাটতির মুখে পড়ছে মার্কিন বাহিনী।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সামরিক ও নিরাপত্তাগত দায়িত্ব রয়েছে। ফলে একটি যুদ্ধে পুরোপুরি গোলাবারুদ শেষ করে ফেলার ঝুঁকি নেয়া ওয়াশিংটনের পক্ষে সম্ভব নয়। তার মতে, এই ধরনের অস্ত্রের ঘাটতিই মার্কিন কৌশল পরিবর্তনের প্রয়োজন তৈরি করেছে। গ্র্যাজিয়ারের বিশ্লেষণ, এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে ঝুঁকছে।
পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরে যাওয়ার প্রধান সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বা নৌ অবরোধ হলে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এই প্রণালিকে ট্রাম্পের ‘মার্কিন ভূখণ্ড’ ঘোষণার হুমকি এবং ইরানের পাল্টা অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ ও তেহরানের প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে।
