চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৭৫০টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। সেই সঙ্গে এসব ‘অদক্ষ’ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য একটি বিশেষ আদালত গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠান ‘ভুয়া’ মুনাফার হিসাব দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রাবোও সুবিয়ান্তো। খবর স্ট্রেইট টাইমসের।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। এ লক্ষ্যে দেশটি দুর্নীতিবিরোধী আইন শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং বেশ কয়েকজন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
১৪ আগস্ট ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় ভাষণ ও বাজেট বক্তৃতায় প্রাবোও বলেন, ইন্দোনেশিয়ার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে দেশের জনগণ যথেষ্ট সুবিধা পাচ্ছে না।
তিনি ‘অত্যধিক সংখ্যক অদক্ষ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের’ সমালোচনা করে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লোকসান দেখায়, আবার একই সঙ্গে মুনাফার দাবি করে।
এদিন প্রাবোও বলেন, ‘ওই মুনাফাগুলো আসলে বানানো।’
দেশটির প্রেসিডেন্টের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় তালিকাভুক্ত মোট ১ হাজার ৭৪টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৯০টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মাত্র প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো কখনো এমনভাবে পরিচালিত হয় যেন তারা যা খুশি করতে পারে। দেশের প্রতি তাদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই।’
২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেয়া প্রাবোও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম তদন্তে ‘বিশেষ অ্যাডহক আদালত’ গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রয়োজনে এই তদন্ত গত তিন দশকের কার্যক্রম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলেও জানান তিনি।
তবে যারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়েছেন, তাদের জন্য ‘বিশেষ ক্ষমা’ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাম তেল, নিকেল, টিন, কয়লা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার আরও বেশি সুবিধা পাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন প্রাবোও।
আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি একটি নতুন খনিজ ও পণ্য বিনিময়কেন্দ্র (কমোডিটি এক্সচেঞ্জ) গঠনের আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের দাম নির্ধারণ করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।
ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে বেশ কয়েকটি অনুমোদিত কমোডিটি এক্সচেঞ্জ রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
প্রাবোও বলেন, ‘খুবই বেশি ক্ষেত্রে আমাদের সম্পদের দাম- যা ইন্দোনেশিয়ার মানুষের মাটি ও ঘামের মাধ্যমে অর্জিত- বিদেশে, অন্য দেশগুলোতে এবং বিদেশি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে নির্ধারিত হয়।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যারা এসব পণ্যের মালিকও নয়, তারাই তাদের দাম নির্ধারণ করে। বিষয়টি কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।’
প্রাবোও আরও বলেন, ‘তারা (ক্রেতারা) যদি আমাদের নির্ধারিত দাম দিতে না চায়, তাহলে তাদের কিনতে হবে না।’
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারে ৫০ ট্রিলিয়ন রুপিয়া সাশ্রয়
প্রাবোও পার্লামেন্টকে জানান, ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পরিচালনার জন্য গঠিত সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারা-র অধীনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশীয় রুপিয়া (প্রায় ৩.৫৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার) পরিচালন ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে।
পরিচালক ও কমিশনারদের বেতন কমানো, ভবন ও গাড়ি ভাড়ার ব্যয় কমানো এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণে খরচ কমানোর মাধ্যমে এই সাশ্রয় হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় ‘উন্নতি’ আনার ফলে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ৭৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ৩২৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়ায় পৌঁছেছে বলেও দাবি করেন প্রেসিডেন্ট।
তবে দুর্নীতির ধারণাসূচকে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান এখনো দুর্বল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণাসূচকে দেশটি ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৩৪ পয়েন্ট পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ও গোটা অঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হয়ে উঠেছে সরকারি দুর্নীতি।
প্রাবোও সরকারের বহুল সমালোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে স্কুলে খাবার সরবরাহ কর্মসূচি। এটি প্রেসিডেন্টের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও নীতিগত প্রকল্প।
১৪ আগস্ট প্রাবোও জানান, নানা সমস্যা ও সমালোচনা সত্ত্বেও কর্মসূচিটি ‘উন্নতি ও দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে’ চালিয়ে যাওয়া হবে।
বহু বিলিয়ন ডলারের এই খাদ্য কর্মসূচি এরই মধ্যে ব্যাপক খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা এবং দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত হয়েছে। কর্মসূচিটি তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থার সাবেক প্রধানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
