বিদ্যুতের লোডশেডিং কমছে না। তীব্র গরমের মধ্যেই লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি ঘাটতির মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের তথ্য তুলে ধরে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে গতকাল মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার একটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মানবজমিনকে বলেন, আমরা নিরাপত্তা চেয়ে আগেই চিঠি দিয়েছি। চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, আমরা চিঠি পাওয়া মাত্রই শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
সূত্র মতে, দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের যে বরাদ্দ তারা পায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করে।
গত কয়েকদিনে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত গড় চাহিদা ছিল প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা এমনকি ১২ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে আইজিপিকে।
এদিকে, চলমান বিদ্যুৎ সংকটের জন্য গ্যাসের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নতুন একটি কৌশলে কাজ শুরু করার কথাও জানান তিনি। আমরা একটা কৌশল নিয়েছি। আমরা সেই কৌশলটা মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নিয়েছি। আমরা আশা করছি, বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে, ইনশাআল্লাহ। সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে, সেটি দিনক্ষণ বেঁধে বলা সম্ভব নয়। তবে জনদুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় সামিটের টার্মিনালে কার্গো খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এক্সিলারেট টার্মিনালটি আংশিক সক্ষমতায় চলছে। এটিকে পুরো সক্ষমতায় চালাতে হলে আবার প্রায় ৭২ ঘণ্টার জন্য টার্মিনালটি বন্ধ রাখতে হবে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গতকাল জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট; লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা ৬টায় উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৫৭৭ মেগাওয়াট, সর্বোচ্চ চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে দোকান-শপিংমল, ৭টার পর আলোকসজ্জায় মানা: দেশের সব শপিংমল ও দোকানপাট রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার পর দোকানপাট ও শপিংমলে আলোকসজ্জায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপ-সচিব মো. মামুন ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়, গত ১১ই জুন থেকে বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকানসমূহ রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বলবৎ ছিল। তবে বুধবার থেকে বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকানসমূহ বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা, সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধকরণ এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এই সময়সীমা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান এবং অনুষ্ঠিতব্য মেলা বা বাণিজ্যমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে জানিয়ে নির্দেশনায় আরও বলা হয়, খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান ইত্যাদি এই নির্দেশনার আওতাবহির্ভূত থাকবে। এই অবস্থায় বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকানসমূহ প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার পাশাপাশি সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধকরণ, সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বা অনুষ্ঠিতব্য মেলা কিংবা বাণিজ্যমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
