নিয়োগের পর নতুন বিধি করে শিক্ষককে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না: হাইকোর্ট

ফন্ট সাইজ:

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় বিদ্যমান বিধিমালা উপেক্ষা করে পরবর্তীতে প্রণীত কোনো শর্ত বা বিধি অতীত থেকে কার্যকর দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এমপিওভুক্তির দাবিতে চার শিক্ষকের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেয়া রায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
‘মো. আবু হানিফ ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় গত ৩০ জুন বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মী রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি উর্মী রহমান।
রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. আতাউর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ওয়ালিউল ইসলাম অলি ও মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রবিধান (রেগুলেশন-২০১৫) অনুসরণ করে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রোজি মোজাম্মেল মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগে প্রভাষক (তৃতীয় শিক্ষক) পদে মো. আবু হানিফসহ চারজনকে ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন ৩০ ডিসেম্বর তারা নিজ নিজ পদে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এনটিআরসিএ-সংক্রান্ত পরিপত্র জারির আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত এবং ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রকাশিত ৭২৬ জন শিক্ষকের তালিকায় ওই চার শিক্ষকের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় তাদের এমপিও আবেদন ‘এনটিআরসিএ সনদ নেই’—এই কারণ দেখিয়ে নামঞ্জুর করা হয়। পরে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন চার শিক্ষক।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রশাসনিক প্রয়োজনে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাকরির বিধিমালা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারে। তবে পরবর্তীতে পরিবর্তিত কোনো বিধি ইতোপূর্বে চাকরিতে যোগদানকারী ব্যক্তির অর্জিত অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে না।
আদালত বলেন, ২০১৫ সালে যখন রিটকারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এনটিআরসিএ সনদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এনটিআরসিএ সনদের শর্ত ২০১৯ সালের প্রবিধানে প্রথম যুক্ত হয়।
তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোয় নেই—রাষ্ট্রপক্ষের এমন দাবির বিষয়ে আদালত বলেন, সরকার নিজেই একাধিক পরিপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এ দাবির আইনগত ভিত্তি নেই।
রায়ে আরও বলা হয়, এমপিও প্রদান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও যুক্তিসঙ্গত আইনগত ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশিমতো বা স্বেচ্ছাচারীভাবে তা করা হলে সেটি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারযোগ্য হতে পারে।
চার শিক্ষকের এমপিও দিতে নির্দেশ
চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্ট এনটিআরসিএ সনদ না থাকার কারণ দেখিয়ে চার প্রভাষকের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যানের অনলাইন সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে রিটকারী চার শিক্ষককে এমপিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে প্রাপ্য সকল বকেয়াসহ আর্থিক সুবিধা চার রিটকারীকে পরিশোধ করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন