১৯৪০ সালে জার্মানি ও জাপানের সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বিরোধিতার ভিত্তিতে ‘অক্ষশক্তি’ নামে পরিচিত জোটে যোগ দিয়েছিল। তারা একটি বিশ্বযুদ্ধে লড়ে এবং পরাজিত হয়। এরপর পরবর্তী ৮৫ বছর দুই দেশের জনগণ অপেক্ষাকৃত ছোট সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তার জন্য তাদের সাবেক শত্রু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে দুই দেশের পুরোনো সতর্কতা আবারও ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে উত্থানশীল বিশ্বশক্তি চীন এবং আগ্রাসী রাশিয়াকে ঘিরে উদ্বেগও বেড়েছে। টোকিও ও বার্লিন দ্রুত তাদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করছে। আর আবারও তারা নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করছে।
ফ্রান্সের এভিয়ানে চলতি সপ্তাহে জি-৭ দেশগুলোর নেতাদের বৈঠকে তাদের সহযোগিতা আরও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে দুই দেশ নিজেদের পুনঃসামরিকীকরণের প্রচেষ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মতো অস্ত্র, প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময় করছে। এটি কোনোভাবেই অক্ষশক্তির পুনরাবৃত্তি নয়। এবার জাপান ও জার্মানি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে একত্র হচ্ছে। বার্লিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে টোকিও চীন ও উত্তর কোরিয়ার হুমকি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তারা একই মতাদর্শের অন্যান্য ‘মধ্যম শক্তি’র সঙ্গেও জোট বাঁধছে। এর মধ্যে রয়েছে জি-৭-এর সদস্য বৃটেন, কানাডা ও ফ্রান্স- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যারা ছিল তাদের শত্রু। এখন তারা নিজেদের আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে- যেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর দাদাগিরি ঠেকাতে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
মার্চে জাপানের একটি নৌঘাঁটিতে জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোরিস পিস্তোরিয়ুস বলেন, জার্মানি ও জাপানের মতো দেশগুলো, যারা এখনো নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমর্থন করে, তাদের ‘আরও ঘনিষ্ঠভাবে একত্র হওয়া এবং আমরা কীসের পক্ষে দাঁড়াই, তা স্পষ্ট করা’ প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে এসে জার্মানি ও জাপান তাদের বিধ্বস্ত শহর পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়। নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বড় একটি দায়িত্ব তারা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্র দেশের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। জার্মানি দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম জার্মানিতে বড় সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে এবং সেখানে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করে। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সরকার দুটিই বড় সেনাবাহিনী বজায় রেখেছিল। কিন্তু বার্লিন প্রাচীর পতন এবং শীতল যুদ্ধের অবসানের পর পুনরেকত্রীকরণ হওয়া জার্মানি প্রতিরক্ষার তুলনায় সামাজিক কর্মসূচিতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে শুরু করে।
যুদ্ধ-পরবর্তী জাপান মার্কিন চাপিয়ে দেয়া একটি সংবিধান গ্রহণ করে, যা জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল। ওই সংবিধানে জাপানকে যুদ্ধ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলেই ‘সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সেস’ বা আত্মরক্ষা বাহিনী গঠিত হয়, যা এখনো দেশটির সামরিক বাহিনীর সরকারি নাম। যুদ্ধের পরবর্তী কয়েক দশকে দুই দেশেই সামরিকতাবাদবিরোধী আন্দোলন জনপ্রিয়তা পায়। এসব আন্দোলন শান্তি, কূটনীতি, মুক্ত বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের আদর্শকে সামনে তুলে ধরে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই মনোভাব দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর এবং চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের অধীনে দেশটির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে পরিস্থিতি বদলেছে। ইউরোপে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার জন্য তার আগ্রহ- দুই দেশকেই দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়ানোর পথে আরও এগিয়ে দিয়েছে।
জাপান ও জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক থমাস বার্জার বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে দুই দেশ ‘সম্ভবত বিশ শতকের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের’ জন্য দায়ী ছিল। তাদের পরাজয় ‘সাম্রাজ্য ও সামরিকীকরণ নিয়ে তাদের আদর্শ ও বিশ্বাসকে চূর্ণ করে দিয়েছিল।’
কিন্তু বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে ডনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির নীতি, দেশ দুটির তুলনামূলকভাবে নতুন দুই রক্ষণশীল ও প্রতিরক্ষামুখী নেতার মধ্যে উদ্বেগ ও তাড়াহুড়ো তৈরি করেছে। বার্জার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে- এমন একটি ন্যায্য ভয় তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।’
এক বছর আগে ক্ষমতায় আসার কিছুদিন আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস জার্মান সরকারের ঋণ নেয়ার ওপর থাকা সীমা শিথিল করার একটি সফল উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন। এর ফলে সামরিক ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। কয়েক বছরের মধ্যে জার্মানির সামরিক ব্যয় ফ্রান্স ও বৃটেনের সম্মিলিত সামরিক ব্যয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে। জাপান জার্মানির প্রায় অর্ধেক অর্থ ব্যয় করছে। তারপরও দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী রাষ্ট্র। চলতি বছর দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
রক্ষণশীল রাজনীতিক প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত বছর সামরিক বাহিনী পুনরুজ্জীবিত করার জাতীয়তাবাদী আহ্বান নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তিনি দক্ষিণ জাপানে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছেন, যেগুলো চীনে পৌঁছাতে সক্ষম। একই সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী অস্ত্র রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও তিনি প্রত্যাহার করেছেন। মের্ৎস ও তাকাইচি দু’জনই ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তারা সামরিক জোটের ক্ষেত্রে ক্রমশ ওয়াশিংটনের বাইরেও বিকল্প খুঁজছেন।
সম্প্রতি জাপান অস্ট্রেলিয়াকে যুদ্ধজাহাজ সরবরাহের জন্য ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াকে যুদ্ধজাহাজ রপ্তানির বিষয়েও দেশ দুটি আলোচনা করছে। অন্যদিকে জার্মানি ইউক্রেনের সঙ্গে নতুন অস্ত্র তৈরি ও মোতায়েনে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তুলতে ফ্রান্সের সহায়তাও চেয়েছে। চীন ও রাশিয়া তাকাইচির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সামরিকতাবাদ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করার অভিযোগ করেছে। তবে তাকাইচি বলেছেন, জাপানের নীতিগুলো প্রয়োজনীয়। কারণ চীন ও উত্তর কোরিয়ার হুমকির কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে জাপান এখন ‘সবচেয়ে গুরুতর ও জটিল’ নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখে রয়েছে।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘এখন কোনো একক দেশ একা নিজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে না। ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে আমরা যে পথে এগিয়ে এসেছি, সেটি ধরে রাখার প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
জার্মান জনগণ অনিচ্ছার সঙ্গে হলেও জাপানিদের তুলনায় দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, অধিকাংশ জার্মান নাগরিক মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব শীতল যুদ্ধের সময়ের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। জরিপে আরও দেখা গেছে, দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সামরিক বাহিনীতে ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে। যদিও বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ব্যবস্থা না থাকা জার্মান সশস্ত্র বাহিনী তরুণদের সেনাবাহিনীতে যোগদানে উৎসাহিত করতে হিমশিম খাচ্ছে।
চলতি বসন্তে টোকিওতে কয়েক হাজার মানুষ তাকাইচির নিরাপত্তানীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। অস্ত্র রপ্তানি বাড়ানো এবং একটি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও ছিল তাদের আপত্তির কারণ। বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা, তাকাইচি এরপর সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারেন। ওই অনুচ্ছেদে যুদ্ধ পরিত্যাগের কথা বলা হয়েছে।
৩৭ বছর বয়সী নাহোকো হিশিয়ামা কয়েকটি বিক্ষোভ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, তাকাইচির নীতিগুলো গভীরভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এগুলোর লক্ষ্য জাপানকে একটি সামরিক শক্তিতে পরিণত করা। বার্লিনে জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক আলেকজান্দ্রা সাকাকি জাপান নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, সামরিক শক্তি বাড়াতে হলে জার্মানি ও জাপানকে নিজেদের মানসিকতায় আরও পরিবর্তন আনতে হবে, বিশেষ করে যদি সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের মতো নীতি গ্রহণ করে।
তিনি বলেন, সামরিক বাহিনী ও সমাজকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ভাবতে হবে তাদের। তারা কি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকবে? তারা কি লড়াই করতে প্রস্তুত থাকবে? এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে জনসমর্থন প্রয়োজন জাপান ও জার্মানির। জার্মানি ও জাপানের এই সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগকে যে একটি দেশ স্বাগত জানিয়েছে, সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।
ডনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে মিত্র দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি ব্যয় করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন, যাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী অন্যত্র মনোযোগ দিতে পারে। গত বছর মের্ৎসের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি জার্মানির সামরিক ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তবে কিছুটা সতর্কতাও ছিল তার বক্তব্যে। রসিকতা করে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, পুনরায় সামরিক শক্তিশালী হয়ে ওঠা জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করা মার্কিন নেতাদের হয়তো খুব একটা খুশি করবে না।
