১৯৭১ সালের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের তথাকথিত ‘সোনালি অধ্যায়’ এখন অনেকটাই অতীত হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। বাণিজ্যিক একীভূতকরণ, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, জ্বালানি ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি- সবই এখন নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত এখনো অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হলেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে নতুন করে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে সম্পর্ক উল্টো দিকে মোড় নেয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি কমলেও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে চীন ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দুই দেশের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হলো জ্বালানি সহযোগিতা। বাংলাদেশের কাছে ভারতের বিদ্যুৎ রপ্তানি, মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন- এসব উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি প্রবাহ বাড়িয়েছে এবং অবকাঠামো সহযোগিতার একটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে।
ভবিষ্যতে সহযোগিতা ক্রমশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং বাজারভিত্তিক আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে। এ অর্থে জ্বালানি সহযোগিতা কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতের বিষয় নয়; বরং এটি আঞ্চলিক জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম। ভারত থেকে বাণিজ্যের কিছুটা সরে যাওয়ার পেছনে মূলত অশুল্ক বাণিজ্যিক বাধার বা এনটিএমের (নন-ট্যারিফ মেজারস) ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ করে স্থলবন্দরে বিধিনিষেধ আরোপ, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক এবং কঠোর পরীক্ষা বা সনদপত্রের প্রয়োজনীয়তা।এসব নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, খাদ্যপণ্য ও উৎপাদনশিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি পড়ে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের প্রশ্নের কাছে জিম্মি রাখা উচিত নয়। শেখ হাসিনা, তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাদের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু ভবিষ্যতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নির্ধারিত হওয়া উচিত দুই দেশের জনগণের স্বার্থের ভিত্তিতে।
দ্বিতীয়ত, দুই দেশেরই সীমান্ত দিয়ে পণ্য ও সেবার আরও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা উচিত। যদি বাণিজ্যিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বাড়তেই থাকে, তাহলে বন্ধুত্ব দুর্বল হবে। দুই দেশ হয়তো প্রতিবেশী হিসেবে পাশাপাশি থাকবে, কিন্তু কার্যকর অর্থে একটি প্রকৃত প্রতিবেশী সম্পর্ক গড়ে উঠবে না।
তৃতীয়ত, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির পাশে অবস্থিত হওয়ার সুবিধা বাংলাদেশকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। একটি সুপরিকল্পিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে কেবল পণ্য বাণিজ্যের সংকীর্ণ কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, সেবা, মানদণ্ডের সমন্বয়, ডিজিটাল বাণিজ্য, লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন সহজীকরণ এবং আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন উন্নয়নের মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের একটি চুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের বা এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় বৈদেশিক বাজারগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পরিবর্তিত হবে। অন্যদিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরতর অর্থনৈতিক একীভূতকরণ দেশটির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ বা ‘পূর্বমুখী সক্রিয়তা’Ñদুই নীতিকেই এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থ এই নয় যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অনিবার্য পতন ঘটবে। একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পুনঃসূচনা করতে হলে দুই সরকারকেই আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেল, স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। সম্পর্কের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দিল্লি ও ঢাকার প্রয়োজন এমন একটি নতুন সূচনা, যা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক বোঝার ঊর্ধ্বে উঠে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যাবে।
(লেখক নয়াদিল্লির রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজের (আরআইএস) অধ্যাপক। তার এই লেখাটি অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ)
