অগ্নিঝরা জুলাইয়ের গণআন্দোলনে চিকিৎসকদের অবদান অনস্বীকার্য উল্লেখ করে বক্তারা বলেছেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অসংখ্য চিকিৎসক নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েছেন। আবার অনেকে নানা ধরনের চাপ, ভয়ভীতি ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। জুলাইয়ের এই অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রোববার বিএমইউতে ডকটরস রেজিস্ট্যান্স ডে বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত এবং প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজিত “অগ্নিঝরা জুলাইয়ে চিকিৎসকদের অবদান” শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই আসলে ৩৬ দিনের নয়, জুলাই ১৭ বছরের। যেদিন দেশে গণতন্ত্র হরণ করা হয়েছে, সেদিনই জুলাইয়ের সূচনা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের কৃতিত্ব ১৮ কোটি মানুষের। তবে এই দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করতে হবে।
তিনি জানান, জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ ও জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে জুলাই অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখনো অনেক জুলাই যোদ্ধা স্বীকৃতির আওতায় আসেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। একইসঙ্গে গত ১৭ বছরের আন্দোলনে গুম ও হত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও যথাযথ মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অপশক্তির বিরুদ্ধে সবাই এক থাকতে পারলে কেউ ষড়যন্ত্র করতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জুলাইয়ে চিকিৎসকদের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়াকে দুঃখজনক উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ে অনেক হাসপাতালে আহত রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, আবার যারা সাহস করে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন তাদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা চিকিৎসকের শপথ ভঙ্গ করে আহতদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেছেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
নিজের জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি নিজে জুলাইয়ে আহত হয়েছিলাম। আমাকে সেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল, পরে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন আমি দেখেছি, চিকিৎসকরা নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন। এটাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের আদর্শ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে কোনো একটি শ্রেণি বা পেশার মানুষ নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ে চিকিৎসকদের অবদান এখনো যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এ বিষয়ে সরকার নিশ্চয়ই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
অধ্যাপক যাকারিয়া আল আজিজ বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান না হলে দেশের মানুষ আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতো। জুলাইয়ে চিকিৎসকরাও দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন একদল আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং অন্যদল গণহত্যার পক্ষে শান্তি সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যারা ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
অধ্যাপক মাযহার শাহীন বলেন, জুলাই ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যেখানে সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করেছিল।
বিএমইউ’র প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের যুদ্ধের কমান্ডার হিসেবে যদি একজনকে চিহ্নিত করতে হয়, তিনি হলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, তিনি দেশে ছিলেন বলেই আমরা রাস্তায় ছিলাম। জুলাই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই জুলাই সকল জনগণের।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ এমন কোনো গণআন্দোলন নেই, যেখানে চিকিৎসকদের অবদান ছিল না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে জুলাইয়ের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি বা দখলদারিত্বের কোনো সুযোগ যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য চিকিৎসকসহ সকল গণতন্ত্রকামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিএনপি’র সহ-পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিকুল কবির লাবু বলেন, জুলাইয়ের চেতনাকে কেউ বিক্রি করার চেষ্টা করবেন না। একাত্তরের চেতনা বিক্রি করতে গিয়ে দেশকে বিভক্ত করা হয়েছে। তাই কোনো চেতনা বিক্রি না করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, জুলাই একদিনে আসেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। গত ১৭ বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে এবং জুলাইয়ে এসে তা পূর্ণতা পেয়েছে। তিনি বলেন, আমার কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের পড়ানো, কিন্তু বিবেকের তাড়নায় আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি।
সাংবাদিক সাহেদ আলম বলেন, ৫ই আগস্টের যাত্রা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। চিকিৎসকদের অবদান শুধু জুলাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও চিকিৎসকদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত। তাই চিকিৎসকদের এই অবদান ও সম্মান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহীদ ডা. মো. কবিরুল ইসলামের সহধর্মিণী শামসুন নাহার শেলী।
শহীদ ডা. সজীব সরকারের পিতা হালিম সরকার বকুল আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, তার ছেলে সজীব ১৮ জুলাই নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তার দুই সন্তানই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তার মেয়ে রাবার বুলেটে আহত হওয়ার পর বাড়িতে ফিরে জানতে পারেন, তার ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল, সে বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিকিৎসক হবে। সে বিখ্যাত হয়েছে, কিন্তু শহীদ হয়ে।
তিনি আরও বলেন, শহীদ সজীবের অসুস্থ মায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে নিতে বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম নিয়মিত সহযোগিতা করেছেন। এজন্য তিনি ও তার পরিবার অধ্যাপক রফিকূল ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে নরসিংদী মেডিকেল কলেজ শহীদ ডা. সজীব সরকারের নামে নামকরণের অনুরোধ জানান।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলন ও ত্যাগের প্রয়োজন হয়েছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, হামলা-মামলাসহ অসংখ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন গণতন্ত্রকামী মানুষ। এই দীর্ঘ ত্যাগের ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের সৃষ্টি এবং জুলাইয়ে তরুণদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের পথ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকদের বর্তমান অবস্থার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক রফিকূল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও তারা আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত নন। বিগত সময়ে নির্যাতিত ও বঞ্চিত চিকিৎসকদের অনেকেই এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত পদায়ন ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। তিনি চিকিৎসকদের এই অবহেলা দূর করে তাদের অবদান ও ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানান।
