বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ভৌগোলিক নৈকট্য, অভিন্ন নদী, ঐতিহাসিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বন্ধন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভারত কি এখনও শেখ হাসিনা কেন্দ্রিক পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নতুনভাবে দেখতে প্রস্তুত? আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা হলো অতীতের সেই ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক সম্পর্কের কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। জনগণের প্রত্যাশা বদলেছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে পুরোনো সম্পর্কের কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা করলে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশা এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। অতীতে কোনো সরকার কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, সেটি ইতিহাসের অংশ। কিন্তু অতীতের কোনো সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
গত দেড় দশকে ভারত ও আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার একটি বিশেষ পর্ব ছিল। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করেছে। এসব সহযোগিতার অনেক ক্ষেত্রই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা এক বিষয় নয়। সরকার পরিবর্তিত হয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হয়, জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পরিবর্তিত হয়; কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকে থাকে রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থের ওপর।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ভারত এখনও পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের আলোকে বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করছে। এই ধারণা সম্পূর্ণ সত্য কি না, সেটি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তেবে খালি চোখে সেটিই বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু কূটনীতিতে শুধু বাস্তবতা নয়, বাস্তবতা সম্পর্কে জনগণের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি দেশের জনগণের মধ্যে যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে সরকার-সরকার সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও জনগণ-জনগণ সম্পর্কের আস্থা পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে, যেখানে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুন ২০২৬-এর চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। একই সময়ে চীন বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ। তবে এটি এখনো একটি প্রস্তাবিত করিডোর, বাস্তবায়িত অর্থনৈতিক করিডোর নয় এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।
চীনের সঙ্গে আলোচনায় মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে ঈযরহবংব ঊপড়হড়সরপ ধহফ ওহফঁংঃৎরধষ তড়হব উন্নয়নের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ১০০ শতাংশ ঃধৎরভভ ষরহবং-এ শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এসেছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়েও সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব উদ্যোগের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ভারত থেকে দূরে সরে যেতে চায়। বরং এর অর্থ হলো বাংলাদেশ তার অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বহুমুখী করতে চাইছে।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিকশিত হচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করবে—এটাই স্বাভাবিক। এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এই বহুমুখীকরণ ভারতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে: বাংলাদেশকে আর কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন শুধু বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে না; ভারতের জন্যও এর গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত প্রভাব রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দরভিত্তিক যোগাযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য কার্যকর সংযোগের সুযোগ তৈরি করে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হলে ভারতের পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ ও ব্যয় তৈরি হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ‘অপঃ ঊধংঃ’ নীতি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ যদি তার বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করে এবং চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে অবকাঠামো, বন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়ায়, তাহলে ভারতের জন্যও এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশের বাজারও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক টানাপড়েন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের বিষয়। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মানবপাচার এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুতে কার্যকর সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই প্রয়োজনীয়। পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ দুর্বল হলে এসব ক্ষেত্রেও সমন্বয় জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে অভিন্ন নদী, বাণিজ্যিক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার পারস্পরিক প্রভাব এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এই ভূগোল পরিবর্তন করা যাবে না। বাংলাদেশ যতই চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াক, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী হিসেবেই থাকবে। একইভাবে ভারত যতই তার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব বিস্তৃত করুক, বাংলাদেশের সঙ্গে তার ভৌগোলিক সম্পর্ক অপরিবর্তিত থাকবে।
তাই বাস্তবসম্মত কূটনীতি হলো পরস্পরকে এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং পরিবর্তিত বাস্তবতাকে স্বীকার করে নতুন ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গড়ে তোলা। বাংলাদেশের জন্য যেমন ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও বাংলাদেশের সঙ্গে আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
আমার মতে, সমস্যার একটি বড় অংশ এখানেই ভারত যদি এখনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অতীতের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে দেখতে থাকে, তাহলে নতুন সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করা কঠিন হবে। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ক নিয়ে ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত বা কৌশলগত বিবেচনা থাকতে পারে। ভারত তার নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে অবস্থান নিতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই অতীত সমীকরণকে প্রধান ভিত্তি করে রাখলে তা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে যদি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে এবং ভারতীয় ভূখণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন ধারণা বাংলাদেশে তৈরি হয়, তাহলে জনমনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়তে পারে। এখানে ভারতের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক? দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় পথটিই ভারতের জন্য বেশি লাভজনক।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক না থাকলে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ক্ষতির ধরন এক হবে না। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো পানি ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, সীমান্ত সহযোগিতা, যোগাযোগ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলগত অবস্থান, বাণিজ্য, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয় ‘কার বেশি ক্ষতি হবে?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত‘কীভাবে দুই দেশের বৈধ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়?’ এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছে নেই। উত্তর রয়েছে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে।
বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করাও বাংলাদেশের জন্য সমীচীন নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, চীনের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকবে, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অংশীদারিত্ব থাকবে এটাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কূটনৈতিক পথ।
ভারতের জন্যও বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখন আর আগের রাজনৈতিক কাঠামোর বাংলাদেশ নয়। নতুন প্রজন্ম, নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকেও প্রভাবিত করবে। এই বাস্তবতাকে ভারত যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ততই ভালো হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণের পুনরাবৃত্তির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। শেখ হাসিনা বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ককে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একমাত্র কাঠামো হিসেবে ধরে রাখার পরিবর্তে দুই দেশকে তাদের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। ভারতের জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করে নতুন সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ করা।
আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রথম শর্ত হলো ভারতকে ‘হাসিনা-কেন্দ্রিক বাংলাদেশ’ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশকে দেখতে হবে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং পরিবর্তনশীল রাষ্ট্র হিসেবে; তার জনগণের রাজনৈবাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের স্থায়ী ভিত্তি কোনো ব্যক্তি নন, কোনো রাজনৈতিক দলও নয়। স্থায়ী ভিত্তি হলো ভূগোল, জনগণ, তিক আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থকে সম্মান করতে হবে।
পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা এবং ভবিষ্যতের অভিন্ন সম্ভাবনা।
তাই এখন সময় অতীতের ‘হাসিনা কার্ড’ নিয়ে রাজনীতি করার নয়; বরং সেই কার্ডের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি নতুন, বাস্তববাদী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলার। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই বাংলাদেশকে হাসিনার বাইরে দেখতে শিখতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং কনভেনার, সাদা দল, আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ভারতকে ‘হাসিনা’ থেকে বের হতে হবে
অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
৯ আগস্ট (রবিবার), ২০২৬, ৭ঃ২১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
