সরকারের পর্যবেক্ষণ শেষ, অ্যাকশন শুরু

সরকারের পর্যবেক্ষণ শেষ, অ্যাকশন শুরু

ফন্ট সাইজ:

শেষ হচ্ছে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার পর্যবেক্ষণ পিরিয়ড। আগামী ১৭ই আগস্ট বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পূর্ণ হবে। শুরুতেই নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নানা কর্মকৌশল গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। ভিভিআইপি প্রটোকল প্রত্যাহার, কৃচ্ছতাসাধন-নীতি অবলম্বন, দুর্নীতি ঠেকাতে কঠোর মনোভাব, অতিসাধারণ চলাফেরার মতো কিছু প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নেন সরকার প্রধান। তারেক রহমানের এমন নীতিতে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন মন্ত্রী-এমপিরাও। এই ছয় মাসব্যাপী এসব কর্মকৌশল বাস্তবায়নে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকার।

মন্ত্রী-এমপিরাও সাবধানে পা বাড়ান। সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের পরও কিছু ইস্যুতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন কয়েকটি মন্ত্রণালয়। অতিকথনের জন্য সমালোচিত হন কয়েকজন মন্ত্রী। এসব ইস্যুতে চাপের মুখে পড়ে সরকারও। তবে কৌশলী সিদ্ধান্ত নিয়ে এসব সংকট উতরানোর চেষ্টা করছেন সরকার প্রধান। সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ১৮০ দিনের কর্মপ্রস্তুতির পর্যবেক্ষণ শেষে গৃহীত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে অ্যাকশনে যাচ্ছে সরকার। এই ছয় মাসে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্সও মূল্যায়ন করা হবে। দুর্বল পারফরম্যান্সের জন্য কয়েক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরও রদবদল হতে পারে।

এদিকে ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা শিগগিরই জাতির সামনে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। একইসঙ্গে গত ছয় মাসে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বাস্তবায়িত উদ্যোগ, নীতিগত সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার মূল্যায়নও তুলে ধরা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ধারাবাহিক বৈঠক শেষে সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সরকারের যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ: সরকার দায়িত্ব নিয়েই বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে- যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এরমধ্যে ভোটের কালি না শুকাতেই ১৯ দিনের মাথায় পরিবারের নারী প্রধানকে মাসিক আড়াই টাকা ভাতার ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়। আগামী ১৬ই আগস্ট কিশোরগঞ্জ থেকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। যা আগামী চার বছরে এক কোটি ৬০ লাখ পরিবার পাবেন। দেশের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করা হয়। এ ছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়। একইসঙ্গে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়। কৃষকদের সেচ সুবিধার জন্য ও জলাধার বাড়াতে দেশ জুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হয়। ইতিমধ্যে এর সুফল পেতে শুরু করেছেন কৃষক। এ ছাড়া গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে সরকার।

তরুণদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে দেশব্যাপী নতুন কুঁড়ি কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে স্কুল পর্যায়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট চালু করা হয়। এ ছাড়া সব শিক্ষার্থীর মাঝে স্কুল ড্রেস, জুতা এবং পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের ভুলে দেশের হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত হামের টিকা এনে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকা দেয়া হয়। বিগত সরকারের আমলে বন্ধ হওয়া কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চালু করা হয়। প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মেট্রোরেল ও ট্রেন ভ্রমণে ভাড়ার ওপর ২৫ শতাংশ ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে পতিত শেখ হাসিনার বাসভবনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়। এ ছাড়া ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২৫০টি পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার।

এদিকে বেশ কিছু মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে- পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা ব্যারেজ মহাপ্রকল্প, রাজধানীর গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত দ্বিতীয় মেট্রোরেল প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সুফল পাবে জনগণ।
যেসব ইস্যুতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সরকার: দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিনের মধ্যে কয়েকটি ইস্যুতে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের সংকটে পড়ে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে অক্টেনের জন্য দীর্ঘলাইন তৈরি হয়। তেলের অভাবে পুরোদমে বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে না পারায় বেড়ে যায় লোডশেডিং। বাধ্য হয়ে মার্কেট খোলা রাখায় সময় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দীর্ঘ এক মাসের বেশি সময় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কিনে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটায়। এরপর এক দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। গত মাসে মহেশখালীর এলএনজি’র টার্মিনালে ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

ফের সিএনজি পাম্প ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট দেখা হয়। ফের বেড়ে যায় লোডশেডিংও। গ্যাস সংকটে বেশ কিছু শিল্পকারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যায়। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামে বিরোধী দলগুলো। এতে চাপের মুখে পড়ে সরকার। গত বুধবার মহেশখালীর এলএনজি’র টার্মিনালের ত্রুটি সারলে ২-৩ দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা দেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ওদিকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তোপের মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে সরকার। যদিও প্রধানমন্ত্রী কৌশলী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। মন্তব্যের জন্য সংসদে শিক্ষামন্ত্রী দুঃখপ্রকাশ করায় আন্দোলন থেমে যায়। ওদিকে পতিত সরকারের রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে আরেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় বিএনপি সরকার। বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংক সংকটে পড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করে সরকার। এ ছাড়া বাজেটে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের ওপর কর কমিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে চ্যালেঞ্জে পড়তে হয় সরকারকে। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদী সরকারের সাজানো প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়।

অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এদিকে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, একটি সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য ৫-৬ মাস সময় যথেষ্ট নয়। তবে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে জোর দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত হলো- প্রশাসনে পরিবর্তন জরুরি ছিল। ফ্যাসিবাদী আমলের সাজানো প্রশাসন নিয়ে কাজ করা যায় না। তাই সরকার দলবাজ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দক্ষদের পুনর্গঠন ও রদবদলের চেষ্টা করছে। যদিও প্রশাসনে সত্যিকারের ভালো কর্মকর্তা পাওয়া কঠিন। কারণ প্রশাসনে ১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগপন্থি লোকজনই বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগও ছিল সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা কতোটা সার্থক হয়েছে সেটা তাদের পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে। তৃতীয়ত- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে চাঁদাবাজি সেভাবে রোধ করা যাচ্ছে না।

কারণ দুর্বল পুলিশের কারণে সরকার কঠোর ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক সচেতনতারও অভাব রয়েছে। কারণ দিনশেষে সরকার ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক নেতাদের দায় বহন করতে হবে। সেজন্য জনগণ যেন আস্থা না হারায় সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
সরকারের মুখপাত্র ও তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।

শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সফরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার প্রতিফলন যেন প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে দেখা যায়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সব মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালনা করা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন