বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় দীর্ঘ ১৪ বছর পর তদন্তে নতুন গতি এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘটনাটি পৃথকভাবে তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে মানবজমিনকে তিনি জানান, প্রথম দফায় ইলিয়াস আলীকে অপহরণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে তাকে অপহরণ করা হয় বলে প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সেনা হেফাজতে থাকা উইং কমান্ডার সাইফকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।
আগামী রোববার গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে আদেশ হতে পারে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। একইসঙ্গে তদন্তে আরও উঠে এসেছে পরিকল্পিত গুমের (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) পদ্ধতিগত অপরাধের অভিযোগ, শেখ মামুন খালেদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা এবং জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চলমান গুমের মামলার সঙ্গে ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে। এই মামলায় আসামি হতে পারেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, জিয়াউল আহসান, বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানসহ আরও কয়েকজন।
ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তার থাকা শেখ মামুন খালেদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মামুন খালেদের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে কিছু তথ্য প্রমাণ পেয়েছি। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করছি। তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তে রয়েছে।
জিয়াউল হাসান মামলার এক সাক্ষীর বক্তব্যে ইলিয়াস আলী গুমের তথ্য উঠে এসেছেÑ এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই সাক্ষ্যের মাধ্যমে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পেয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রথম দফায় ইলিয়াস আলীকে অপহরণের একটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। পরে আরেকটি অভিযানে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে তাকে অপহরণ করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে জিয়াউল আহসান নিজে ইলিয়াস আলীকে গুলি করেছিলেন কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারবো না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এর আগে, গত ২১শে জুলাই সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে কীভাবে গুম করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন সে সময়ের র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালকের ‘রানার’ ও সেনা সদস্য ইমরুল কায়েস। একইসঙ্গে জিয়াউল আহসানের ভারত-বাংলাদেশ জুড়ে বিস্তৃত এক ‘কিলিং নেটওয়ার্ক’ এবং বিডিআর সদস্যদের হত্যার বিষয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে তার সাক্ষ্যে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইমরুল বলেন, ২০১২ সালের ১৩ই এপ্রিল র্যাব সদর দপ্তর থেকে মেজর জিয়াউল, মেজর নওশাদ ও সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। কাকে গাড়িতে তোলা হবেÑ তা আমি জানতাম না। তবে গাড়িতে বসে জিয়াউল স্যার বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে ‘টার্গেট কখন আসবেন’ সে বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে জানা যায় টার্গেট আসবে না। পরে স্যারকে বাসায় নামিয়ে দেয়া হয়। পরদিন আমি ৯ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাই। তিনি আরও বলেন, ছুটিতে থাকাকালে ১৮ই এপ্রিল জানতে পারি, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ২৩শে এপ্রিল কর্মস্থলে যোগ দেয়ার পর দেখি পুরো র্যাব সদর দপ্তরে থমথমে পরিবেশ। একদিন জিয়াউল স্যার ফোনে কথা বলছিলেন। এর মধ্যে তার আরেকটি ফোনে কল আসে। তখন তিনি পাশের লোকটিকে বলেন ‘তুই রাখ। তারিক স্যার ফোন দিয়েছেন’।
সেনা সদস্য ইমরুল ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ফোনে তারিক স্যারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার একপর্যায়ে জিয়াউল স্যার উচ্চস্বরে বলে ওঠেনÑ ‘আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এ রকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দিন।’ এ ছাড়া, ইলিয়াস আলীকে গুমের পর র্যাব সদর দপ্তরের বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল স্যার নিজ হাতে ধ্বংস করে ফেলেন বলে সাক্ষ্য উল্লেখ করেন ইমরুল কায়েস।
