যেসব কারণে মন্ত্রণালয় থেকে সরানো হলো শিক্ষকদের বদলি

যেসব কারণে মন্ত্রণালয় থেকে সরানো হলো শিক্ষকদের বদলি

ফন্ট সাইজ:

হাতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশপত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছিলেন একজন নারী শিক্ষক। তার দুই সন্তানের একজনের হার্টের সমস্যা, আরেকজন প্রতিবন্ধী। তাদের কারণে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই একই শহরে চাকরি করা জরুরি। বুধবার এই শিক্ষক শিক্ষা সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে এত ভিড় যে তিনি সময়-সুযোগ করে উঠতে পারছেন না। কথা বললেও তিনি নাম প্রকাশ করতে চান না। বলেন, আমার বদলি হওয়াটা জরুরি। এই শিক্ষিকার মতো শত শত শিক্ষক প্রতিদিন ভিড় করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

দেশের প্রশাসনিক রাজধানী কিংবা প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়। প্রতি তলায় আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয়। হয়তো শিক্ষাই একমাত্র মন্ত্রণালয়; যেখানে প্রায়শই দরজা লাগিয়ে রাখতে হয়। ডিও লেটার, তদবির; নানা কারণে এই মন্ত্রণালয় থাকে সরগরম। যার অধিকাংশই বদলির সুপারিশ। শিক্ষামন্ত্রী ডা. আ ন ম এহছানুল হক মিলন একাধিকবার এসব সুপারিশের কথা বলে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এসব কারণে নিয়মিত বিঘ্ন হচ্ছে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। আবার শিক্ষকদের ভিড়ে গড়ে উঠেছে শক্ত সিন্ডিকেট। যে সিন্ডিকেট বেশ পুরনোও বটে। এরই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিসিএস শিক্ষক বদলির একক নিয়ন্ত্রণ খর্ব করা হয়েছে। তিন স্তরে ভাগ করে দেয়া হয়েছে বদলির দায়িত্ব।

শিক্ষা ক্যাডারের ১৬ হাজারের বেশি শিক্ষক। প্রায় প্রতিদিন দুই শতাধিক আবেদন জমা হয় বদলির জন্য। তাদের চাপে নিয়মিত কাজ করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। অধিকাংশ শিক্ষকের হাতে সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় নেতা এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও সুপারিশপত্র।
এ সুযোগে মন্ত্রণালয়ে তৈরি হয়েছে মধ্যস্বত্ব¡ভোগী। তারা অর্থের বিনিময়ে বদলি বাণিজ্য করে যাচ্ছেন। কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এটি এতটাই গোপনীয়তায় মাধ্যমে হয় যে, বদলি হওয়া শিক্ষকরা তা নিয়ে মুখ খুলতে চান না। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সিন্ডিকেটের ভেতরে রয়েছে এলিট শ্রেণির কোরাম। এসব কারণে ভোগান্তির মুখে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে শিক্ষকরা নামে-বেনামে পত্র পাঠাতে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অবগত হওয়ার পরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলির ক্ষমতা খর্ব করেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর নতুন নীতিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে মন্ত্রণালয়। সেই নীতিমালা অনুযায়ী অঞ্চল, মাউশি অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়- এই তিন স্তরে সম্পন্ন হবে বদলি কার্যক্রম। আবার নতুন সমস্যার মুখে পড়েছেন শিক্ষকরা। বদলিপ্রত্যাশী এক শিক্ষক বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে এই কাজ সরে যাওয়ায় আরেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। নতুন কার্যক্রমে যাওয়ার আগে অধিকাংশ শিক্ষক চাচ্ছেন বদলি কার্যক্রমটা শেষ হয়ে যাক। ফলে এই ভিড় আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটা অনলাইনের মাধ্যমে হলে আরও ভালো হতো। এতে স্বচ্ছতা ও তথ্যগত প্রবাহটা ঠিক থাকতো। আমার মতো অনেক শিক্ষকই ভয় পাচ্ছেন, নতুন পদ্ধতিতে আরও বেশি ভোগান্তিতে না পড়তে হয়।

গত ২৬শে জুলাই বদলি নীতিমালার একটি খসড়া প্রকাশ করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা যায়। নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি কলেজের প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকরা নিজ নিজ অঞ্চলের বদলির জন্য আবেদন করবেন। অঞ্চলের কমিটি সেই আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মাউশি পরিচালক কমিটির সভাপতি এবং সহকারী পরিচালক (কলেজ) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেনÑ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক এবং জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি)।
ঢাকা মহানগরী এবং বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থার পদ ছাড়া সারা দেশে কর্মরত সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের শিক্ষকদের বদলি আবেদন নিষ্পত্তি করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কমিটি। মাউশি’র মহাপরিচালক কমিটির সভাপতি এবং উপ-পরিচালক (কলেজ-১) সদস্য সচিব হবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেনÑ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (কলেজ-২) এবং মাউশি’র সহকারী পরিচালক (কলেজ)। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি কাজ করবে। তারা বিভিন্ন সংস্থা, দপ্তরের পদের বদলি-পদায়ন সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ ছাড়া অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সিটি করপোরেশন ও মহানগরীতে পদায়নের সিদ্ধান্তও নেবে এই কমিটি। কমিটিতে উপসচিব (কলেজ-১ অথবা ২) সদস্য সচিব থাকবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন কলেজ অনুশাখার অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, বদলির জন্য শিক্ষকদের দূর-দূরান্ত থেকে সচিবালয়ে আসতে হয়। যার কারণে তারা যেমন ভোগান্তিতে পড়েন, আমরাও ঠিকমতো কাজ করতে পারি না। তাই বদলির সিদ্ধান্তগুলো অঞ্চল ও অধিদপ্তর পর্যায়ে ভাগ করে দেয়া হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বদলির জন্য আমাদের প্রচুর সময় দিতে হয়। অনেক সময় তাদের চাপে আমরা নীতিনির্ধারণী কাজগুলো করতে পারি না। বদলির কারণে বাড়তি একটা চাপ থাকে। এজন্যই বদলিকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। আশা করি, এর মাধ্যমে সচিবালয়ে ভিড় কমবে, মন্ত্রণালয়ের গতি বাড়বে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন