১ কোটি ৩০ লাখ টিআইএনধারীর অর্ধেকের বেশিই রিটার্ন জমা দেননি

১ কোটি ৩০ লাখ টিআইএনধারীর অর্ধেকের বেশিই রিটার্ন জমা দেননি

ফন্ট সাইজ:

আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা চার দফা বাড়িয়ে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত করা হলেও রিটার্ন জমা দেয়ায় প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৩০ লাখ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিবন্ধন নিলেও রিটার্ন দাখিল করেছেন মাত্র ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার করদাতা। অর্থাৎ নিবন্ধিত টিআইএনধারীদের প্রায় ৬২ শতাংশই এবার আয়কর রিটার্ন জমা দেননি। ফলে, নিবন্ধিত করদাতার মাত্র ৩৮ শতাংশ রিটার্ন দাখিল করেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কোভিড-১৯ মহামারির পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সময়কাল অর্থাৎ ২০২০-২১ এর কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রিটার্ন দাখিলের এই হার গত প্রায় এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিআইএনধারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। সেই বছর রিটার্ন জমা পড়েছিল প্রায় ৪৫ লাখ। এক বছরের ব্যবধানে টিআইএনধারীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও কর-আনুগত্যে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। গেল অর্থবছরে রিটার্ন জমা পড়েছে মাত্র ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার, যা মোট টিআইএনধারীর ৩৮ শতাংশ।

যদিও রিটার্ন দাখিলের হার আশাব্যঞ্জক না হলেও, সার্বিক আয়কর আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের আয়কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.০২ শতাংশ। টিআইএনধারী বাড়লেও কেন অনেকে রিটার্ন জমা কাক্সিক্ষত হারে হচ্ছে না, এমন বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সঞ্চয়পত্র কেনা বা জমি রেজিস্ট্রি করার মতো ৪৫ ধরনের বেশি জরুরি কাজের জন্য টিআইএনের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে অনেক মানুষ কেবল এই সেবাগুলো পাওয়ার জন্যই টিআইএন নেন, কিন্তু তাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকায় তারা রিটার্ন দেয়া প্রয়োজন মনে করেন না। তিনি বলেন, আয়কর রিটার্ন দাখিলের অনলাইন বা অফলাইন প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে এখনো জটিল মনে হয়। সঠিক নির্দেশনার অভাবে অনেকে রিটার্ন দাখিল করা থেকে বিরত থাকেন। অনেকের ধারণা, রিটার্ন জমা দেয়া মানেই বাড়তি ঝামেলা। এ ছাড়া কর ব্যবস্থার জটিলতা এবং করের টাকা কীভাবে ব্যয় হয় সে বিষয়ে সঠিক ধারণা নেই সাধারণ মানুষের। এসব জটিলতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। করদাতাদের ঝামেলা কমাতে এবং ঘরে বসে সহজে রিটার্ন দিতে অনলাইন রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থার পরিধি আরও সহজ ও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কর গবেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, আয়কর আইনের বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলসংক্রান্ত বিধান কার্যকর হলে কর-আনুগত্য বাড়বে।

ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ব্যাংক ঋণ, ঋণপত্র (এলসি) খোলা কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র নিশ্চিত করা গেলে মানুষ রিটার্ন দিতে উৎসাহিত হবেন। এদিকে করপোরেট করদাতাদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার করপোরেট টিআইএনধারীর মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছে মাত্র ৪২ হাজার প্রতিষ্ঠান। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৬৫৯। অন্যদিকে রিটার্ন দাখিল প্রত্যাশিত না হলেও আয়কর আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৩.০২ শতাংশ বেশি। একইভাবে মোট রাজস্ব আদায়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরে এনবিআর মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা থেকে ১২.৩ শতাংশ বেশি। তবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.৯০ শতাংশ। আর রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে বড় উৎস মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাত থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.৮০ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে লক্ষ্য ধরা হয় ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। ওই লক্ষ্য পূরণে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন