জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সব দেখে মনে হচ্ছে, আরেকটা অনিবার্য বিপ্লব আসন্ন। এই বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। গতকাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার জনগণের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে। গণভোটের গণরায় মানার দাবিতে আপস করার জন্য আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, আপনারা যদি বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, আমাদের তো অস্থিরতার কোনো কারণ ছিল না। দেশের বারোটা বেজে যাবে আর আমরা বসে বসে আঙ্গুল চুষবোÑএটা হবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যেমন শিশু থেকে বৃদ্ধÑ সব বয়সী মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন, তেমনি ভবিষ্যতের যেকোনো আন্দোলনেও দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেবে।
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমীর বলেন, এ ব্যাপারে আপস করার জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের চাপ দেয়া হচ্ছে। আমাদের লোভ দেখানো হচ্ছে। আমরা দেশবাসীকে সাক্ষী রেখে বলতে চাই, আপনাদের গণরায়ের পাহারাদারি আমরা করবো। তিনি বলেন, কোনো কিছুর বিনিময়ে এ দাবি থেকে সরে আসা হবে না। প্রয়োজনে জীবন দিয়েও দাবি আদায় করা হবে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে শফিকুর রহমান বলেন, জেল-জুলুমের ভয় দেখাবেন না, ফাঁসির ভয় দেখাবেন না। ফাঁসির রশি যদি জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটিকে ফুলের মালা হিসেবেই গ্রহণ করবো।
শিক্ষাঙ্গনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারো পুরনো দখলদার রাজনীতি ও ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমীর বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সংকট তৈরি করে পরে মূল্যবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের রায়কে যারা অপমান করেছে, তাদের সবাইকেই অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। ‘লড়াই কেবল শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি’।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বিগত কয়েক মাস ধরে আমি বারবার প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি বিভেদ সৃষ্টি না করতে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন না, যেখান থেকে আপনাদের পতন শুরু হবে। গতকাল দেশের তিনটি জায়গায় যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেটিই প্রমাণ করে আপনার দলের ভেতরেই এমন লোক রয়েছে, যারা আপনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায় না।
গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখাই তাকে সাহায্য করার প্রকৃত উপায়। তিনি বিএনপি’র উদ্দেশ্যে বলেন, তারা যেন অতীতের সহিংস ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির পথ থেকে ফিরে আসে। অন্যথায় জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যেখানেই যাই মানুষের সর্বত্র একটাই দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হতে হবে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য অটুট রাখতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, আর যা ঘটিয়েছেন তার মাঝে কোনো মিল আছে কিনা প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, একদিকে দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, যুবদলের হেলমেট বাহিনীকে দিয়ে বিরোধী দলমতকে আক্রান্ত করবেন, রক্তাক্ত করবেন আরেকদিকে বলবেন ঐক্য বজায় রাখতে! এটাই ফ্যাসিবাদের আচরণ।
এতে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমেদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক জুলাইযোদ্ধা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিকের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ ফয়সাল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত উল্লাহ টুটুল, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির এবং এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি। এ ছাড়াও ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
