প্রামাণ্যচিত্রে ছাত্র আন্দোলনের কথা নেই

প্রামাণ্যচিত্রে ছাত্র আন্দোলনের কথা নেই

ফন্ট সাইজ:

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, আমরা চাই, ২০২৪ সালের ইতিহাস বাংলাদেশের সকল মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাস হোক। এই ইতিহাস থেকে কোনো জুলাইযোদ্ধাকে বাদ দেয়া চলবে না। এটাই একটি রাষ্ট্রীয় প্রামাণ্যচিত্রের ভাষ্য হওয়া উচিত ছিল। গতকাল রাজধানীর চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভা এবং জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ডকুমেন্টারিতে জুলাইয়ের অনেক চিত্র বাদ দেয়া হয়েছে বলে তাৎক্ষণিক জুলাইযোদ্ধারা সেøাগান দিতে থাকেন। এ সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে এনসিপি’র সদস্য সচিব এসব কথা বলেন এবং উপস্থিত উত্তেজিত জুলাইযোদ্ধাদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জুলুম-নিপীড়ন ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছিল। আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম, যখন মনে হচ্ছিল ফ্যাসিবাদী সরকার ২০৪১, ২০৭১-এর মতো সময়সীমা ঘোষণা করে ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে থেকে যাবে এবং মুক্তির আর কোনো পথ নেই। ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের আপামর জনতা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল রাজপথে জীবন দেয়ার মধ্যদিয়ে এই দেশকে নতুন করে মুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলাম।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের সেই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, আমরা তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। যারা আহত হয়েছেন, তাদের অনেকেই আজও দুই চোখে দেখতে পান না, অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার অনেকে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। আমাদের শহীদ পরিবার এবং আহত জুলাইযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এনসিপি’র সদস্য সচিব বলেন, আমরা বিনীতভাবে আহ্বান জানাতে চাই এখনো অনেক শহীদের নাম সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অনেক গুরুতর আহত যোদ্ধাকেও ভুলভাবে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে, যা তাদের যথাযথ স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। তাই আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত এই তালিকা হালনাগাদ করা হোক, আহতদের ক্যাটাগরি বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। এর কারণে যেসব আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে সেগুলো দূর করা হোক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আখতার বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই বাংলাদেশে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, সেই আওয়ামী লীগের গুন্ডারা এখনো বিভিন্ন স্থানে জুলাইযোদ্ধাদের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, এসব সন্ত্রাসীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, সেই অপরাধের জন্য দল হিসেবেও তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের অংশীদার আমরা সবাই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আজ আমরা কোনো দলীয় কর্মসূচিতে নয়, একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছি। আর একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের দায়িত্ব হলো সকলের অবদানকে সমানভাবে ধারণ করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আজকের আয়োজনে আমরা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে এনসিপি’র এই নেতা বলেন, আপনারা লক্ষ্য করেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন একসময় একপেশেভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছিল, আজও তেমনি একটি প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা তরুণ প্রজন্ম জীবনের ঝুঁকি নিয়েও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা বলেছি, কারণ সেটি ইতিহাসের অংশ। ইতিহাসকে কখনো মোছা যায় না।
তিনি বলেন, একইভাবে ২০২৪ সালের ‍জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা অংশগ্রহণ করেছেন তিনি বিএনপি’র হোন, জামায়াতের হোন, বামপন্থি হোন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, প্রবাসী কিংবা সমাজের যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষই হোন না কেনÑ তাদের সবার অবদান আমরা সব সময় স্মরণ করেছি এবং ভবিষ্যতেও করবো।

প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, আজ যে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হলো, সেখানে যে ব্যানারে এই আন্দোলন শুরু ও পরিচালিত হয়েছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ সেই ব্যানারের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হলো না। অথচ এই আন্দোলন একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে, এরপর ধাপে ধাপে আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। ঐতিহাসিক নয় দফা কর্মসূচি আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, সেই ৯ দফা এখানে অনুপস্থিত থেকে গেল। আমরা আরও দেখলাম, ৩রা আগস্ট শহীদ মিনারে ঘোষিত ঐতিহাসিক এক দফা, যা আন্দোলনের সবচেয়ে সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি, সেটিও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এটি আমাদের আহত করে।

এনসিপি’র সদস্য সচিব আরও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো ইতিহাসকেও দলীয়করণের চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী মঞ্চে দাঁড়িয়ে এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছেন। এজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমি এটিকে নিছক অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে মনে করি না; বরং সচেতনভাবেই ইতিহাসকে বিকৃত ও দলীয়করণের চেষ্টা করা হয়েছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির বিষয়ে দৃষ্টিপাত করে এনসিপি’র এই নেতা বলেন, আজকের দিনটি বিজয়ের দিন, গৌরবের দিন। সরকার একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে, আমরা চেয়েছিলাম শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতে। সে কারণেই আমি আপনাদের সামনে এসেছিলাম। আপনারা, জুলাইযোদ্ধারা, আমার কথা ধৈর্য সহকারে শুনেছেন। এজন্য আমি আপনাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। অনুষ্ঠান চলাকালেই আমরা জানতে পারি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার এবং তার সঙ্গে রিফাত রশিদ, আব্দুল কাদের, আব্দুল হান্নান মাসুদসহ আরও কয়েকজনকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে মাহিন সরকার আমন্ত্রিত অতিথি হওয়া সত্ত্বেও অনুষ্ঠানস্থলে থাকতে পারেননি। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে হলরুম ত্যাগ করতে হয়েছে।

এটি শুধু এখানকার ঘটনা নয় জানিয়ে তিনি বলেন, আজ দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও আমি জুলাইযোদ্ধাদের একজন হয়ে এবং আমার দলের একজন প্রতিনিধি হয়ে আজকের অনুষ্ঠানের সফলতা কামনা করছি।

আখতার হোসেন বলেন, আমার ব্যক্তিগত অবস্থান এবং আমার সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আজকের এই অনুষ্ঠানে আর অবস্থান করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মহামান্য প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে যেভাবে অবস্থান নিয়েছেন, আমরা সেটিকে সম্মান করি। তিনি একইসঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন জুলাইযোদ্ধা। তার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়েই আমি নীরবে এই অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি। আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন