৫ই আগস্ট আজ। ২০২৪ সালের ‘৩৬শে জুলাই’। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দিন। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে এদিন অবসান ঘটেছিল দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীন দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা এর আগে আর ঘটেনি। ৫ই আগস্ট দেশের রাজনৈতিক বাঁক বদলের গুরুত্বপূর্ণ একদিন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য বিলোপ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো রাজপথে নেমে আসা আপামর জনতার বিজয়ের এই দিন দুনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসেও অনন্য এক সংযোজন। রক্তস্রোত, ঘটনাবহুল ৫ই আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকী আজ। ঘটনা প্রবাহে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে প্রথমবার পালিত হচ্ছে দিবসটি। জাতীয় দিবস হিসেবে আজ সরকারি ছুটির দিন।
রাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশ সামনে রেখে এবার পালিত হচ্ছে দিবসটি। অভ্যুত্থানের ঠিক দুই বছর পর মানুষের আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যাশা কতোটা পূরণ হয়েছে- এই প্রশ্ন এখন অনেকের সামনে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি।
২০২৪-এর জুলাইয়ের আন্দোলনের বড় লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বদল ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। বৈষম্য, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়টা পার হয়েছে নানা টানাপড়েনের মধ্যদিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের রূপরেখা তৈরির নামে দীর্ঘ সময় পার করে জুলাই জাতীয় সনদ ঘোষণা করে। নানামুখী চাপে পড়ে নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট। প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের আসনে বসে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। বড় অংশীদার ’২৪-এর আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ-শিক্ষার্থীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। বহু আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ইতিমধ্যে দু’টি অধিবেশন পার করেছে।
নতুন সরকার ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যয় সাশ্রয় ও গণমুখী নানা উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম ভোগাচ্ছে নতুন সরকারকে। গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর টানাপড়েন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। একইসঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতা ও হানাহানির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলছে।
২৪ এর আন্দোলনে দেশে নতুন একটি রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেছে। এনসিপি’র মতো তরুণদের একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার বছর পেরোনোর আগেই তারা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে। একই সঙ্গে এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ একেবারে মাঠছাড়া অবস্থায় পড়েছে। দলের শীর্ষ নেতারা হয় পলাতক, না হয় জেলে। নেতাকর্মীরা দিগভ্রান্ত। সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে দলটির কার্যক্রম। গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ভারতে পালিয়ে আছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা। এমন অবস্থায় দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত চব্বিশটি মাসে বাংলাদেশ যেমন স্বৈরাচারের জগদ্দল পাথর বুক থেকে নামিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছে, তেমনি নতুন ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের নতুন রাজনৈতিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মুখোমুখিও হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণই এখন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে বড় বলে মনে করা হচ্ছে।
ওদিকে ‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’- প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি পালিত হবে। সরকারি কর্মসূচির মধ্যে আছে-মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বেলা ১২টায় জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। সভায় সভাপতিত্ব করবেন- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার সকাল ৬টা ১ মিনিটে শাহবাগস্থ জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। দিবসটি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনসমূহেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।
এছাড়া দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, সামরিক জাদুঘর, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরসহ সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রসমূহ শিশুদের জন্য দিনব্যাপী উন্মুক্ত রাখা হবে। সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি ভবন ও স্মৃতিস্তম্ভ জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার পাশাপাশি রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ক্যানভাস তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে স্থাপিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করা হবে আজ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকালে জাদুঘরের উদ্বোধন করবেন। এর বাইরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহীদদের কবর জিয়ারত, স্মৃতি ফলকে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
