শহীদ শিক্ষক, বন্ধু, প্রিয়জনের স্মৃতি নিয়ে লেখা প্রকাশের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু শহীদ ছাত্রের স্মৃতি ও স্বপ্ন নিয়ে লেখার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয় না। জুলাইয়ের পটভূমিতে আমাকে রচনা করতে হচ্ছে বুলেটে নিভে যাওয়া এক প্রদীপের কথা: যার নাম হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, জুলাই ২০২৪-এর বীর শহীদ, শ্রেণিকক্ষে আমার সরাসরি ছাত্র।
শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার কথা ভাবলেই মনে হয়, একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়: মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ, অশ্রু এবং অপূর্ণ জীবনেরও ইতিহাস। বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে আমরা সাধারণত তারিখ, স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক ভাষ্যের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ রাখি। অথচ ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা অনেক সময় সেই মানুষগুলো, যাদের নাম পাঠ্য বইয়ের পাতায় বড় অক্ষরে লেখা থাকে না।
তারা বেঁচে থাকেন পরিবারের কান্নায়, সহপাঠীদের স্মৃতিতে এবং জাতির বিবেকের গভীরে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও তেমন অসংখ্য নাম-না-জানা কিংবা অল্প-পরিচিত তরুণের রক্তে লেখা একটি অধ্যায়। তাদেরই একজন হৃদয় চন্দ্র তরুয়া- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, যার জীবন থেমে যায় একটি বুলেটের আঘাতে, কিন্তু যার স্বপ্ন আজও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এটি কেবল একজন শহীদের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার সংগ্রাম, সামাজিক গতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। এ গল্পটি আমি জানি সরাসরি অভিজ্ঞতায়। কারণ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া আমার শ্রেণিকক্ষের সরাসরি ছাত্র। ইতিহাস বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান কোর্স গ্রহণকালে আমি তাকে পাই। ঘটনাগুলো আমার কাছে আমার শহীদ ছাত্রের উপাখ্যান।
অভাবের সংসারে আলোর সন্তান
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার একটি সাধারণ গ্রাম। সেখানেই জন্ম হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার। জন্মের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা জড়িয়ে ছিল না। ছিল কেবল দারিদ্র্যের দীর্ঘ ছায়া। বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া একজন কাঠমিস্ত্রি। দিনের পর দিন মানুষের ঘর বানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিজের পরিবারের জন্য একটি স্বস্তির ঘর গড়ে তোলার সামর্থ্য তার ছিল না। মা অর্চনা রানী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। দুই কক্ষের টিনের ছোট্ট ঘরে প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বড় হয়েছে হৃদয়।
বাংলাদেশের হাজারো নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো এই পরিবারও বিশ্বাস করতো- শিক্ষাই একমাত্র মুক্তির পথ। সেই বিশ্বাসের প্রতীক ছিলেন হৃদয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক- উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, প্রতিভা কখনো দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হয় না। পরে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা মানেই আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। টিউশনি করে নিজের খরচ নিজেই চালাতেন। বাবা-মার কষ্ট কমানোর চেষ্টা করতেন।
তার স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর। তিনি বিসিএস ক্যাডার হতে চেয়েছিলেন। বাবার কাঠের কাজ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। মায়ের চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন। একটি পাকা বাড়ি বানাতে চেয়েছিলেন। এই স্বপ্নগুলো কোনো বিলাসিতা ছিল না; ছিল একটি দরিদ্র পরিবারের বহু বছরের অপেক্ষার নাম।
যে প্রজন্ম রাজপথে নেমেছিল
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন, তখন হৃদয়ও তাদের একজন হয়ে ওঠেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে নয়, বরং একজন শিক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা নাগরিকের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বণ্টিত হওয়া উচিত। অনেকের মতো তারও ধারণা ছিল, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা নাগরিকের অধিকার। সেই বিশ্বাসই তাকে রাজপথে নিয়ে যায়।
বহদ্দারহাটের রক্তাক্ত বিকেল
১৮ই জুলাই ২০২৪। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট। সেদিন নগরীর বাতাসে ছিল অদ্ভুত এক উত্তেজনা। আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলেন শত শত শিক্ষার্থী। হৃদয়ও ছিলেন তাদেরই একজন।
বিকালের দিকে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে গুলির শব্দ। টিয়ার শেল। আতঙ্ক। দৌড়। চিৎকার। হঠাৎ একটি বুলেট এসে বিদ্ধ করে হৃদয়ের গলা ও বুক। মুহূর্তেই ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তে ভিজে যায় তার শরীর। সহপাঠীরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউ জানতেন না, এই তরুণ আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন না।
পাঁচ দিনের অসম যুদ্ধ
আহত হৃদয়কে প্রথমে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তার পরিবারের ছিল না। এরপর শুরু হয় হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো। পরিস্থিতির বিরূপতা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা চিকিৎসাপ্রাপ্তিকে জটিল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
পাঁচ দিন ধরে চিকিৎসকরা চেষ্টা করেন। পরিবার অপেক্ষা করে। বন্ধুরা প্রার্থনা করে। কিন্তু ২৩শে জুলাই হৃদয় হার মানেন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে একটি পরিবারের সমস্ত ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়ে। একটি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে।
যে ফলাফলে নম্বর ছিল না, ছিল ইতিহাস
হৃদয়ের মৃত্যুর কয়েক মাস পর শুরু হয় তার বিভাগের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা। তিনি আর পরীক্ষায় বসতে পারেননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তার আত্মত্যাগকে ভুলে যায়নি। ২০২৫ সালে ফল প্রকাশের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তার নামে একটি বিশেষ সম্মানসূচক গ্রেডশিট প্রকাশ করে। প্রতিটি কোর্সে নম্বর শূন্য। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে সেই শূন্যই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। এটি ছিল কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক স্বীকৃতি- জ্ঞানার্জনের পথে নিহত একজন শিক্ষার্থীর প্রতি সম্মান।
শূন্য ঘর, শূন্য অপেক্ষা
পটুয়াখালীর সেই ছোট্ট ভাড়া বাসায় আজও হৃদয়ের বই রয়েছে। চশমা রয়েছে। খাতা রয়েছে। কিন্তু যার জন্য সবকিছু, তিনি আর নেই। বাবা রতন চন্দ্র তরুয়ার কণ্ঠে এখনো ভেসে আসে অসহায় প্রশ্ন- ‘এখন কার দিকে চেয়ে বাঁচবো?’
এই প্রশ্ন কেবল একজন বাবার নয়। এটি সেই সব পরিবারের প্রশ্ন, যারা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিল ভবিষ্যৎ বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু ফিরে পেয়েছে কফিন।
শহীদের সংখ্যা নয়, মানুষের গল্প
অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, প্রতিটি গণ-আন্দোলনের দুটি ইতিহাস থাকে। একটি রাজনৈতিক। অন্যটি মানবিক। রাজনৈতিক ইতিহাসে লেখা থাকে আন্দোলনের কারণ, সংগঠন, নেতৃত্ব ও ফলাফল। কিন্তু মানবিক ইতিহাসে লেখা থাকে হৃদয়ের মতো তরুণদের অপূর্ণ জীবন। ইতিহাসের বিচার কেবল এই প্রশ্ন করবে না যে, কে ক্ষমতায় এলো বা গেল। বরং প্রশ্ন করবে- কেন একজন দরিদ্র পরিবারের একমাত্র সন্তানকে এমন এক পরিস্থিতিতে জীবন দিতে হলো, যখন তার হাতে থাকার কথা ছিল বই?
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে যাননি। তিনি কোনো মন্ত্রী হতে চাননি। কোনো নেতা হতে চাননি। তিনি মেধার ভিত্তিতে শুধু একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তা হতে চেয়েছিলেন। তার কাছে রাষ্ট্র ছিল চাকরি, পরিবার, দায়িত্ব এবং মর্যাদার স্বপ্ন ও সুযোগ। এই কারণেই তার মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সামনে গভীর নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়; বরং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্যে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন আর একটি বুলেটের সামনে থেমে না যায়।
হৃদয়ের উত্তরাধিকার
আজ যখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে, তখন হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার নামও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার অসমাপ্ত বিসিএস প্রস্তুতি, বাবার জন্য একটি পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্ন, মায়ের চিকিৎসার আকাঙ্ক্ষা- সবকিছুই আজ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের প্রতীক।
রাষ্ট্র হয়তো রাজনীতির নতুন অধ্যায় লিখবে। রাজনীতি নতুন ভাষা খুঁজে নেবে। কিন্তু হৃদয়ের মতো তরুণদের আত্মত্যাগ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে- গণতন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, কোনো ক্ষমতা নয়; বরং সেই তরুণরা, যারা একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে সাহস করে।
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার নাম থাকবে সেইসব তরুণের পাশে, যারা বিশ্বাস করেছিল- একটি ভালো দেশ গড়া সম্ভব। আর সেই বিশ্বাসই তাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
