বিরোধী দলসহ সমাজের সব পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির সদস্যরা। মঙ্গলবার (৪ঠা আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকের কার্যক্রম শুরু করেন। কিছুক্ষণ বৈঠক করার পর তিনি বেরিয়ে যান। এসময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ওদিকে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। প্রথম বৈঠকে কমিটির কাজের পদ্ধতি এবং কাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, সে বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাইযোদ্ধা এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মতামত নেবে কমিটি। এ ছাড়া সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জাতীয় প্রেস ক্লাব এবং বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদ তৈরিতে যারা কাজ করেছেন তাদের কাছ থেকেও মতামত নেবে কমিটি।
আমরা সবার কথা শুনবো: সালাহউদ্দিন
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের এই নবযাত্রা এবং রাষ্ট্রকাঠামোর যে বিবর্তনমূলক কার্যে আমরা যাচ্ছি, রাষ্ট্রকাঠামোর যে গণতান্ত্রিক সংস্কার আমরা করতে চাই, সেগুলো সবই আমরা এখানে অ্যাড্রেস করবো, ধারণ করবো। এটা আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল, এখনো আছে। এই পর্যায়ে আমরা বলেছি, তাদের (বিরোধী দল) সঙ্গে আমরা আলোচনা করবো। দিন-তারিখ এবং তাদের তালিকা নির্ধারণ করে আমরা আলোচনা করবো। এরপর একটি কথা আমি বলেছি, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি নাম দেয়ার কথা ছিল, সেই নামগুলো আমরা এখনো পাইনি। আমি আশা করি, তারা হয়তো অনুধাবন করবেন। এখন তারা হয়তো তাদের নাম দেবেন এবং তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করবো।’
এ ছাড়াও বিরোধী দলের সব সদস্যের পরামর্শ গ্রহণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা যদি মিটিংয়ে এসে দেন, ভালো। মিটিংয়ের বাইরে লিখিতভাবে দিলেও আমরা সেটা গ্রহণ করবো।
এভাবে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই এবং জনপ্রত্যাশার সবকিছু ধারণ করতে চাই। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমরা সেই প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে চাই।’ বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘অলওয়েজ আমরা স্বাগতম জানাবো।’
সংবিধান সংশোধনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন করতে এই কমিটির সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই, আমাদের প্রত্যাশা আছে। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ বলতে চাই না, যেহেতু আমরা উদার এবং ওপেন। আমরা সবার কথা শুনবো।’
তিনি বলেন, ‘এত বড় একটি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংগঠিত হলো, জাতির প্রত্যাশা অনেক, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমাদের এই বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করতে হবে। এই শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যদি আমরা ধারণ করতে চাই, তাহলে সংবিধানেই প্রথম আমাদের সবকিছু ধারণ ও সংরক্ষণ করতে হবে।’
কাদের সঙ্গে কী কী বিষয়ে আলোচনা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আমরা কেবল বসলাম। আমরা যাদের সঙ্গে আলোচনা করবো, সেটা আজই নির্ধারণ করবো। পরেও আলোচনার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আসতে পারেন বা আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। পেশাজীবীরাও আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। আমরা তাদের সবার সঙ্গে আলোচনা করবো। সুতরাং সময়টা এখনই নির্ধারণ করে বলতে পারবো না।’
জুলাই সনদের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৪৮ দফার মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা একমত হয়েছি, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে যেগুলো আছে, সেগুলো তো আমরা নেবোই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি, সেগুলো নোট অব ডিসেন্ট আকারে নেবো। এর বাইরেও আমাদের অনেক বক্তব্য আছে, আমাদের নির্বাচন ইশতেহারে আছে, সেগুলোও আমরা ধারণ করবো। যেগুলো জুলাই জাতীয় সনদে প্রতিফলিত হয়নি, আলোচিত হয়েছিল হয়তো, কিন্তু প্রতিফলিত হয়নি, সেগুলোও আমরা আলোচনা করেই নেবো।’ তিনি বলেন, লক্ষ্য একটাই- সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য, টেকসই এবং জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায় এমন সংবিধান সংশোধনী প্রণয়ন করা।
পুরো সংবিধান পর্যালোচনা: আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, শুধু জুলাই সনদের নির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো আলাদাভাবে দেখলে হবে না। একটি সংশোধনের কারণে সংবিধানের অন্য কোনো অনুচ্ছেদে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। তিনি বলেন, পুরোটা পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে। কারণ হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন রাখতে হবে। একটার সঙ্গে আরেকটা গাঁথুনি রাখতে হবে। সংবিধানের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মৌলিক কাঠামো তত্ত্বও বিবেচনায় রাখতে হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী। এই তত্ত্ব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা গেলেও রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করা যায় না। এ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের কেশবানন্দ ভারতী মামলা এবং বাংলাদেশের অষ্টম সংশোধনী মামলার কথা উল্লেখ করেন। আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের মতাদর্শ বা ইচ্ছা জুলাই সনদ এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে চাপিয়ে দিতে পারবে না। কোনো প্রস্তাব জুলাই সনদ বা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বাইরে গেলে কমিটি সেই পথে যাবে না বলেও জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো বিষয়ে একটি দলের ভিন্নমত থাকলে কোন প্রস্তাব কার্যকর হবে, তার ব্যাখ্যাও জুলাই সনদে দেয়া আছে। সনদের মূল প্রস্তাব, দলগুলোর সম্মতি এবং নোট অব ডিসেন্ট মিলিয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি। আইনমন্ত্রী বলেন, “সুতরাং জুলাই সনদ একটা ডকুমেন্ট; ওই ডকুমেন্টের হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশনটা ওখানেই বলে দেয়া আছে এখানে কোনো ইফস অ্যান্ড বাটের সুযোগ নাই, কোনোরকম ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নাই। ওখানেই বলা আছে জুলাই সনদে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে আলোচনা হয়েছিল সেই আলোচনাকে ধারণ করে জুলাই সনদ দেয়া হয়েছে। সেটাকে সামনে রেখে আমরা করছি। এই দুইটার মধ্যে কোনো পার্থক্য এবং বিভেদের জায়গা আমি দেখি না। কমিটির কাজ পর্যবেক্ষণ করে বিরোধী দল সমালোচনা করতে পারবে জানিয়ে তিনি বলেন, যৌক্তিক কোনো সমালোচনা এলে তা সংশোধনী প্রস্তাবে নেয়ার চেষ্টা করা হবে।
আগামী প্রজন্মের জন্য সংশোধন: চিফ হুইপ
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, এ সংবিধান সংশোধন শুধু বর্তমান সরকার বা সংসদের মেয়াদের জন্য করা হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, একটা সংবিধান সংশোধন আমরা এক বছর বা দু’বছরের জন্য করছি না আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা নাও থাকতে পারি। প্রজন্ম যাতে এই বেনিফিট পায়। জনগণের চাহিদা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে সংবিধান সংশোধন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ। বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্য প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধানের জটিল বিষয়গুলো বুঝে মতামত দিতে তাদের সময় লাগতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিব রহমান, মো. নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল।
