গুলিবিদ্ধ মুজাহিদুলের বেঁচে থাকার সংগ্রাম

গুলিবিদ্ধ মুজাহিদুলের বেঁচে থাকার সংগ্রাম

ফন্ট সাইজ:

২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই শুক্রবার। দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টা। যাত্রাবাড়ী থানা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কাজলা রোডের মাথায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম। হঠাৎ সামনে থেকে ছুটে আসে একটি ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের গুলি। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মো. খাইরুল হাসানসহ কয়েকজন ছাত্র-জনতা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। পরে পরিস্থিতির কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া সম্ভব না হওয়ায় ভর্তি করা হয় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

জীবন বাঁচাতে সেদিনই জরুরি অস্ত্রোপচার শুরু হয়। চার ব্যাগ ‘ও-পজিটিভ’ রক্ত দেয়ার পর চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, গুলির আঘাতে তার শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবন রক্ষার স্বার্থে অস্ত্রোপচারে তার প্লীহা সম্পূর্ণ অপসারণ করতে হয়। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত লিভারের অংশও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।

এরপর টানা দু’দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন। জ্ঞান ফেরার পরও দীর্ঘদিন হাসপাতালের সপ্তম তলায় চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার মধ্যেই শেষ হয়নি তার চিকিৎসা। বরং শুরু হয়েছে আরও দীর্ঘ, আরও কঠিন এক অধ্যায়। বর্তমানে মুজাহিদুল ইসলামের চিকিৎসা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ফলোআপ ভিত্তিতে চলছে। হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে টানা ১০ বছর নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হবে। প্রতিদিন তিন বেলা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়। মোট ১১টি ভ্যাকসিনের মধ্যে ইতিমধ্যে তিনটি নেয়া হয়েছে; বাকি ভ্যাকসিন নির্ধারিত সময়ে নিতে হবে। প্রতি মাসে দুইবার সিবিসি পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়।

চিকিৎসকদের নির্দেশনায় তার দৈনন্দিন জীবনও পাল্টে গেছে। দুই কেজি’র বেশি ওজন বহন করা যাবে না। অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ এড়িয়ে চলতে হবে। শক্ত খাবারও খাওয়া নিষেধ। প্লীহা অপসারণের কারণে সংক্রমণ এড়িয়ে চলাই এখন তার চিকিৎসার অন্যতম প্রধান শর্ত। মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ নেই। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কমে গেছে। নিয়মিত ভ্যাকসিন ও ওষুধ না চললে শরীরের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একসময় যে মানুষটি রাজপথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, আজ তার প্রতিটি দিন কাটে ওষুধের সময়সূচি, ভ্যাকসিনের তারিখ আর চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।

চিকিৎসা শুধু দীর্ঘ নয়, ব্যয়বহুলও। নিয়মিত ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভ্যাকসিনের বড় একটি অংশের খরচ তাকেই বহন করতে হচ্ছে। অনেক সময় সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনও পাওয়া যায় না। তখন বাইরে থেকেই কিনতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমানে তিনি জুলাই যোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। তবে তার ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের তুলনায় এ সহায়তা যথেষ্ট নয়। শারীরিক অবস্থার উন্নতির আশায় বিদেশে চিকিৎসার জন্যও আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় এবং সে সময় তার শারীরিক অবস্থাও অত্যন্ত সংকটাপন্ন থাকায় বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ আর হয়নি। বর্তমান সরকারেও এখন পর্যন্ত সেই সুযোগ পাননি বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, প্রকৃত গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহতদের একটি অংশ এখনো গেজেটভুক্ত বা এমআইএস নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাচ্ছেন না।

মুজাহিদুল ইসলামের প্রত্যাশা, প্রকৃত আহতদের দ্রুত শনাক্ত করে গেজেট ও এমআইএস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। একপর্যায়ে আন্দোলনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজপথের সেই গুলির শব্দ আজ আর শোনা যায় না। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি এখনো বহন করছেন। প্রতিদিন ওষুধের পাতা খুলে, পরবর্তী ভ্যাকসিনের দিন গুনে, চিকিৎসকের কাছে ফলোআপে গিয়ে তিনি নতুন করে উপলব্ধি করেন- কিছু যুদ্ধ অস্ত্র থেমে যাওয়ার পরও শেষ হয় না। আজ তার সবচেয়ে বড় লড়াই বেঁচে থাকার নয়; স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার। আর সেই লড়াইয়ের মাঝেই তার বিশ্বাস- রাষ্ট্র যদি প্রকৃত আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে। এই প্রত্যাশা নিয়েই তিনি প্রতিদিন নতুন একটি সকাল শুরু করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন