স্পেনের উত্তরাঞ্চলের বুরগোস প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম আভেলানোসা দে মুনিও। স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র হাতেগোণা কয়েকজন। নেই কোনো রেস্তোরাঁ, নেই দোকানপাট। একটি বার আছে। কিন্তু তা কখনো খোলে না। পুরোনো একটি ওয়াইন সেলারও বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সপ্তাহে মাত্র একবার পাশের এলাকার একটি বেকারির সাদা ভ্যান রুটি পৌঁছে দিতে আসে। বাকি সময় পুরো গ্রাম যেন নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে। তবে চলতি গ্রীষ্মে সেই নির্জন গ্রামই কয়েক ঘণ্টার জন্য বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গায় পরিণত হতে যাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
এক রাতে দু’বার সন্ধ্যা হবে: আগামী ১২ আগস্ট ২০২৬। আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে ইউরোপের ওপর দিয়ে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ অতিক্রম করবে। ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। আর স্পেনে ১৯১২ সালের পর এটিই হবে মূল ভূখণ্ড থেকে দৃশ্যমান প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। সৌভাগ্যক্রমে আভেলানোসা দে মুনিও সেই সরু পথের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। সেখানে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
মাদ্রিদের পদার্থবিদ ড. মারিয়া তেরেসা লোপেজ সানচেজ বলেন, সূর্যগ্রহণটি সূর্যাস্তের ঠিক আগে ঘটবে। ফলে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দু’বার গোধূলির মতো পরিবেশ তৈরি হবে। তার ভাষায়, মনে হবে যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে দু’বার সূর্যাস্ত দেখছি। এতেই শেষ নয়। ওই রাতেই আকাশে দেখা যাবে বিখ্যাত পারসিড উল্কাবৃষ্টি। ফলে একই রাতে দুটি বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ মিলবে।
যেখানে কিছুই ঘটে না: গ্রামটিতে কোনো কোলাহল নেই। গ্রীষ্মের দুপুরে ল্যাভেন্ডার ফুলের ওপর ভনভন করে উড়ে বেড়ানো মৌমাছির শব্দ, পুরোনো পাথরের ছাদের ওপর দিয়ে ওড়া আবাবিলের ডাক আর দূরে কোনো ট্রাক্টরের গর্জনই এখানে জীবনের প্রধান শব্দ। গ্রামের আশপাশের পাহাড়ে মানুষের চেয়ে ছাগলের সংখ্যাই বেশি। একসময় যেখানে শত শত মানুষ কৃষিকাজ করতেন, এখন সেখানে বিস্তীর্ণ সূর্যমুখী আর গমের ক্ষেত।
২০০ জন থেকে মাত্র ১০ জন: ১৯৩৭ সালে এই গ্রামেই জন্ম নেয়া সারা আলভারেজ রদ্রিগেজ জীবনে কখনো অন্য কোথাও থাকেননি। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৫০-এর দশকে গ্রামটিতে প্রায় ২০০ জন মানুষ বাস করতেন। ছিল ছোট ছোট দোকান। এখানকার মাছ বিক্রেতারা সাইকেলে করে আশপাশের গ্রামে মাছ বিক্রি করতে যেতেন। ৭৩ বছর বয়সী রাউল গ্রান্দে রেভিয়া ছোটবেলায় মাদ্রিদে চলে যান। তিনি মনে করেন সেই সময় ডাকপিয়ন গাধায় চড়ে চিঠি ও সংবাদপত্র পৌঁছে দিতেন। এমনকি আধোঘুমের মধ্যেও গাধাটি নিজেই জানত কোথায় থামতে হবে।
কৃষির বদলে জনশূন্যতা: প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গ্রামের মানুষ বৃষ্টিনির্ভর কৃষি, আঙুর চাষ, সবজি উৎপাদন এবং পশুপালনের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ শুরু হওয়ার পর কর্মসংস্থান কমে যায়। ফলে মানুষ একে একে মাদ্রিদ, বিলবাও, বার্সেলোনা এবং অন্যান্য শহরে চলে যেতে শুরু করেন।
এক রাতের জন্য জনসংখ্যা দ্বিগুণ: পূর্ণ সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে বহু প্রবাসী গ্রামবাসী আবার ফিরে আসছেন। রাউল গ্রান্দে তার সঙ্গী, ছেলে, নাতি-নাতনি এবং বন্ধুদের নিয়ে ফিরবেন। তার ভাইও সন্তান-সন্ততি নিয়ে আসবেন। শুধু তাদের পরিবারই প্রায় ২০ জনের একটি দল নিয়ে গ্রামে আসছে। সারা আলভারেজ জানান, আরও অনেক প্রতিবেশী তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বৃটেন, ফ্রান্স এবং ভেনেজুয়েলা থেকেও অতিথিরা আসবেন।
হোটেল বুকিং শেষ বহু আগেই: কাছের ঐতিহাসিক প্যারাডর দে লেরমা হোটেলটি ২০২২ সাল থেকেই ওই দিনের জন্য সম্পূর্ণ বুকড। কাস্তিয়া ই লেওনের পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তা আলবের্তো বস্কে কোয়েলো বলেন, পুরো অঞ্চলের অধিকাংশ আবাসনই অনেক আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে। তার ভাষায়, সূর্যগ্রহণ দেখতে আসা বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে পরিচিত জায়গা নয়, বরং সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা খুঁজছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া থেকেও আসছেন দর্শনার্থী: রাউল গ্রান্দে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে একটি পরিবার সূর্যগ্রহণ দেখতে স্পেনে আসছে। মাদ্রিদে থেকে যাতে তারা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ মিস না করেন, সে জন্য তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন, কেউ তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন কি না।
গ্রামের গুহাই হবে সেরা দর্শনস্থল: গ্রামের ওপরে ছোট ছোট গুহাগুলোকেই সবচেয়ে ভালো দর্শনস্থল হিসেবে মনে করা হচ্ছে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য দিগন্ত থেকে মাত্র আট ডিগ্রি ওপরে থাকবে। তাই পশ্চিম দিগন্তের বাধাহীন দৃশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুহাগুলো শুধু পর্যবেক্ষণের স্থান নয়; বহু প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষ এখানেই একসঙ্গে সূর্যাস্ত উপভোগ করেছেন। এমনকি গ্রামের এক সাবেক বাসিন্দার অস্থিও এখানেই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
কয়েক মিনিটের জন্য বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু: সূর্যগ্রহণের দিন আভেলানোসা দে মুনিও আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। গ্রিল করা ভেড়ার মাংসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়বে, শিশুদের হাসিতে মুখর হবে বহু আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের চত্বর। তারপর কয়েকটি অবিস্মরণীয় মিনিটের জন্য নেমে আসবে অন্ধকার- এক রাতে দু’বার। আর ভৌগোলিক অবস্থানের এক বিস্ময়কর সৌভাগ্যের কারণে স্পেনের এই প্রায় বিস্মৃত ছোট্ট গ্রামটি সাময়িকভাবে হয়ে উঠবে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।
