আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। যে রাষ্ট্র সময়ের পরিবর্তন বুঝে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারে, তার কূটনৈতিক অবস্থানও তত শক্তিশালী হয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ ঠিক সেই পথেই এগিয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আঞ্চলিক সংযোগ, বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা, জলবায়ু কূটনীতি এবং বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর-এর বাংলাদেশ সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে তার বৈঠক ও মতবিনিময়কে দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতি গুরুত্ব পেয়েছে। এমন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ প্রমাণ করে যে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এখন কেবল দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত বাস্তবতার অংশ।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হলো বঙ্গোপসাগর। আর বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত বাংলাদেশ এখন আর শুধু একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির নাম নয়; এটি আঞ্চলিক সংযোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আজ তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্ভাবনা এবং দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো সবাই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী।
এই বাস্তবতায় ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের উন্নতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি স্বাভাবিক পরিণতি। যুক্তরাষ্ট্র আজ তার বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করছে। নতুন উৎপাদন কেন্দ্র, নির্ভরযোগ্য অংশীদার এবং বিকল্প বাজার খুঁজছে। বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি, তরুণ জনশক্তি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতি এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর দেশের অর্থনীতিকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চ প্রযুক্তি শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আগামী দিনের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হবে। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের শিল্পায়নকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। ঢাকা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, ভারতের সঙ্গে সংযোগ ও বাণিজ্য, জাপানের সঙ্গে শিল্পায়ন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতাও সম্প্রসারণ করছে। আধুনিক কূটনীতির ভাষায় এটিই হচ্ছে স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সিং যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সবার সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এই পরিবর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস এই অঞ্চলে হলেও অর্থনৈতিক সংযোগ এখনও সীমিত। যদি বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তাহলে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।
একই সঙ্গে জলবায়ু কূটনীতিতেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বিশ্বে একটি গ্রহণযোগ্য কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এই খাতে নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বহুপাক্ষিক কূটনীতিতেও বাংলাদেশের ভূমিকা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করছে। আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং সেখানে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে কূটনীতির এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে তথ্যযুদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক সময় প্রকৃত ঘটনাকেও আড়াল করে ফেলে। কিন্তু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব দিয়ে পরিচালিত হয় না। এটি পরিচালিত হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
সার্জিও গরের সফর, ঢাকা-ওয়াশিংটন উচ্চপর্যায়ের সংলাপ এবং দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতি সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই অংশ। ভবিষ্যতে যদি আরও উচ্চপর্যায়ের সফর, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত সংলাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে তা শুধু বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।
শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় পরিষ্কার রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সাফল্য গুজব দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় আন্তর্জাতিক আস্থা, বিনিয়োগ, কৌশলগত অংশীদারিত্ব, বহুপাক্ষিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ দিয়ে। বাংলাদেশ যদি সেই ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কূটনৈতিক পথেই এগিয়ে যেতে পারে, তবে আগামী দশকে দেশটি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আর তখন গুজব নয়, ইতিহাসই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে থাকবে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

নূর মোহাম্মদ এরফান
১ ঘন্টা আগেকঠিন বাস্তবতা হলো আমেরিকা যার বন্ধু (বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর জন্য) তার আর দুশমনের প্রয়োজন হয় না। ওরা সর্প হইয়া দংশন করে ওঝা হইয়া জারে। সাধূ সাবধান সেন্টমার্টিন বাঁচান। ওটা দিয়ে যেন পিরিত না হয় ???