বিপ্লবের স্বপ্ন ফিকে, অনিশ্চয়তায় লাখো মিয়ানমারবাসী

বিবিসির রিপোর্ট

বিপ্লবের স্বপ্ন ফিকে, অনিশ্চয়তায় লাখো মিয়ানমারবাসী

ফন্ট সাইজ:

একদিন আমরা আবার আমাদের স্বাধীনতা ফিরে পাবো- এই বিশ্বাস নিয়েই জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন মিয়ানমারের ২২ বছর বয়সী এক তরুণ। দেশটিতে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরে হাতে অস্ত্রও তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধের পর এখন তিনি যুদ্ধ নয়, শান্তির পথেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান।

তিনি বলেন, আমি যতটা পারি আমার দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। তবে এখন আমি অন্য পথ বেছে নিয়েছি- একটি অহিংস পথ।

বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী শহর মায়ে সটে আশ্রয় নেয়া হাজারো মিয়ানমারবাসীর একজন। নিরাপত্তার কারণে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। একটি দাতব্য সংস্থার পরিচালিত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের ছোট্ট অন্ধকার ঘর থেকে তিনি বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন।

নিরাপদ আশ্রয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

মায়ে সটে থাকা অধিকাংশ শরণার্থী প্রায় নিঃস্ব। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তারা। থাইল্যান্ডে কোনো বৈধ আইনি মর্যাদা না থাকায় এসব নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রই তাদের একমাত্র ভরসা।
২০২১ সালে বয়স যখন মাত্র ১৭, তখন মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভে যোগ দেন ওই তরুণ। সেনাবাহিনী আন্দোলন দমন করলে বহু তরুণের মতো তিনিও জাতিগত বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর তিনি ইয়াঙ্গুনে ফিরে নগর গেরিলা ইউনিটে যোগ দেন এবং পুলিশ স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা হামলায় অংশ নেন। তিনি বলেন, তখন মনে হয়েছিল অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
তবে জান্তাবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি গ্রেপ্তার হন। কুখ্যাত ইনসেইন কারাগারে তাকে সাত বছরের সাজা দেয়া হয়। সেখানে নিয়মিত নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার দাবি করেন তিনি।

গত বছর মুক্তি পাওয়ার পর পরিবারের ওপর কঠোর নজরদারির কারণে তিনি মিয়ানমার ছেড়ে মায়ে সটে পালিয়ে আসেন। তবে কারাগারেই তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে।

তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম বিপ্লব আরও ভালো হবে। কিন্তু বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, তারা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করেছে। এত মৃত্যু আর ধ্বংস আমি সহ্য করতে পারিনি।

পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা ঠিক হবে না বলেও মনে করেন তিনি। আমি শুধু সশস্ত্র সংগ্রামই নয়, রাজনীতির মতো অন্য ধরনের সংগ্রাম থেকেও সরে এসেছি। এখন অন্যভাবে মানুষের পাশে থাকতে চাই, বলেন ওই তরুণ। বর্তমানে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের পড়ান এবং এখনো কারাগারে থাকা বন্ধুদের সহায়তা করার চেষ্টা করেন।

মায়ে সটের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা অধিকাংশ মানুষের গল্প এক হলেও অভিজ্ঞতা ভিন্ন।

কেউ পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের সাবেক যোদ্ধা, কেউ অং সান সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) কর্মকর্তা, আবার কেউ বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এড়াতে দেশ ছেড়েছেন।

তাদের সবার কথায় একটি বিষয়ই স্পষ্ট- তারা এখনো বিপ্লবে বিশ্বাস করেন, কিন্তু পাঁচ বছরের যুদ্ধ তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিয়েছে। এখন পরিবারের জন্য আয়-রোজগার করাই তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা।

এক হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে থাইল্যান্ডে

২০ বছর বয়সী ইন ইন অং স্বামী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে প্রায় এক হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চল থেকে মায়ে সটে পৌঁছেছেন।
সাগাইং ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র। সেখানে নিয়মিত বিমান হামলা ও সামরিক অভিযানে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

ইন ইন জানান, দুই বছরেরও বেশি আগে সেনাবাহিনী তাদের গ্রাম হতোমার দখল করে। তিনি বলেন, ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই বুঝেছিলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তিনটি গুলির শব্দ শুনি। তারপর সবাই চিৎকার করে বলতে থাকে সেনারা আসছে। আমরা শুধু সামান্য কিছু জিনিস নিয়ে দৌড় দিই। বাবা এক বস্তা চাল নিয়েছিলেন, যাতে অন্তত খেতে পারি।

এরপর পরিবারটি পাহাড়ি জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। সেখানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ছিল। “নদীর পানি খেতাম, সেই পানিতেই গোসল করতাম, এমনকি সেটিই টয়লেটের কাজেও ব্যবহার করতাম। অনেকে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।”

ছয় মাস পর গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ এলেও সেখানে ব্যাপক লুটপাট ও বাড়ির চারপাশে পুঁতে রাখা স্থলমাইনের কারণে আর কেউ ফিরতে সাহস করেনি।
জঙ্গলে থাকার সময়ই ইন ইন অংয়ের ছেলের জন্ম হয়। জন্মগত হার্নিয়ার কারণে তার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। মায়ে সটের একটি বেসরকারি হাসপাতাল অস্ত্রোপচারের আগে ৩৮ হাজার থাই বাত (প্রায় ১,১৪০ মার্কিন ডলার) জমা দিতে বলেছে। থাইল্যান্ডে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবাও পান না তারা।
তিনি বলেন, মিন অং হ্লাইং ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমি দেশে ফিরতে পারব না। সবকিছুর জন্য তিনিই দায়ী। সুযোগ পেলে আমি বরং আমার বাবা-মাকেও এখানে নিয়ে আসতে চাই।

তবে সবাই যে হতাশ, তা নয়। আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে বিবিসি কথা বলে ইয়াঙ্গুনের এক সাবেক বারটেন্ডারের সঙ্গে, যিনি এখন কোবরা কলাম নামে পরিচিত বিদ্রোহী ইউনিটের সদস্য। সন্তানের জন্মের জন্য তিনি সাময়িকভাবে থাইল্যান্ডে এলেও আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে চান।

তার ভাষায়, আমি বিশ্বাস করি, একদিন আমাদের বিপ্লব সফল হবেই। কারণ সেনাবাহিনী পুরো দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। যাদের রক্ষা করার কথা, তাদের বিরুদ্ধেই তারা লড়ছে। এই যুদ্ধে তারা শেষ পর্যন্ত জিততে পারবে না।

চীনের চাপ, রাশিয়ার সহায়তা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোবরা কলাম তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) সঙ্গে যৌথভাবে লড়াই করছে।

তবে অন্যান্য অনেক প্রতিরোধ গোষ্ঠী এ বছর অস্ত্র ও প্রযুক্তির সংকটে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের চাপের কারণে তাদের সরবরাহ কমে গেছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক সরকার রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও নতুন সামরিক সরঞ্জাম পাচ্ছে।

এদিকে ইয়াঙ্গুনের উদ্যোক্তা ‘লুইস’ (ছদ্মনাম) অভ্যুত্থানের পর বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, প্রথম দুই-তিন বছর আমাদের মনোবল অনেক উঁচু ছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সবার পারিবারিক দায়িত্ব বেড়েছে। আমার সন্তানদেরও ভালো শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ দরকার। এই চাপ আমাদের বদলে দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে মাত্র ১৩ বছর বয়সী শিশুরাও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিচ্ছে।

একজন সমাজকর্মী এসব শিশুকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের করে এনে মায়ে সটের একটি পুরোনো বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। সেখানে তাদের কাজ শেখানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, কখনো কখনো বিপ্লব নিয়ে হতাশ লাগে। আগে যেসব গ্রাম একে অপরের বন্ধু ছিল, এখন কেউ সেনাবাহিনীর পক্ষে, কেউ প্রতিরোধের পক্ষে- এভাবেই তারা শত্রু হয়ে গেছে।

তার মতে, শুধু অস্ত্র নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন নিয়েও এখন ভাবতে হবে।

যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্টে নির্বাচনের ঘোষণা থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু এবং বেশির ভাগই বিমান হামলার শিকার।
যদিও শত শত সশস্ত্র গোষ্ঠীতে বিভক্ত প্রতিরোধ বাহিনী সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু এলাকা হারিয়েছে, তবুও তারা এখনো দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগও এখন পর্যন্ত সামরিক সরকারের কাছ থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য ছাড় আদায় করতে পারেনি।

ফলে মায়ে সটসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নেয়া লাখো মিয়ানমার শরণার্থী অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও নির্বাসনের জীবন কাটাচ্ছেন। ইন ইন অংয়ের বর্তমান ঠিকানা একটি ছোট, অন্ধকার ঘর। একই ধরনের আরও ১৯টি কক্ষে বসবাস করছেন যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বয়ে বেড়ানো পরিবারগুলো।

ছয় মাস পর এই আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে তাকেও আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বের হতে হবে। আর কবে নিজের দেশে ফিরতে পারবেন, তার কোনো উত্তর আজও নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন