পাঁচ ধাপে চালের দাম গড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়

কৃষক থেকে ভোক্তা

পাঁচ ধাপে চালের দাম গড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়

ফন্ট সাইজ:

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হওয়ার সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে দাম। মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজির কারণে দেশের অন্তত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। এ ছাড়া বাজার ব্যবস্থায় অদক্ষতার কারণেও পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ফলে কৃষক বা উৎপাদকরা সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে চড়া দামে পণ্য কিনে পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ ভোক্তার।
সিপিডি পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’Ñ শীর্ষক সেমিনারে এই এ চিত্র তুলে ধরা হয়। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট ফকরুদ্দিন আল কবীর। সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, একাধিক অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সিপিডি’র গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই পর্যায়ে দাম বাড়ে না; বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, চাল উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজিপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে। ডালের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান। একই চিত্র মরিচের বাজারেও দেখা গেছে। মরিচের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা গড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পিয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। আমিষ জাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়, মাছের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও মুরগির বাজারে পাইকাররা বড় ভূমিকা রাখেন। আর গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারীদের হাত ধরে কেজিপ্রতি গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।

সিপিডি বলছে, খাদ্যের দামের সামান্য ওঠানামা মানেই সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান পড়ে যায়। ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবার তাদের উপার্জনের কমপক্ষে অর্ধেক টাকা ব্যয় করে খাবার কিনতে। আর নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ওই ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডি’র জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।
তার ভাষ্যে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। কেবল উৎপাদনের খরচ বাড়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে না। খাদ্য মূল্যসূচক বা সিপিআই এর ৫৯ শতাংশই খাদ্যপণ্য। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯.৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে ধনী ৫ শতাংশ পরিবার ব্যয় করে মাত্র ২৮.৯ শতাংশ। নিম্নআয়ের লোকজনই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।
বাজার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতারা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল, যা বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্য অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। তার মানে, কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়, খামার পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হার- সবুজ মরিচে ১১৬ শতাংশ, আলু ৫০ শতাংশ, পিয়াজ ৮৭ শতাংশ, চাল ১০০ শতাংশ, ডাল ৭৮ শতাংশ, বেগুন ৭২ শতাংশ, ডিম ২৫ শতাংশ, গরুর মাংস ১৩ শতাংশ, রুই মাছ ১০ শতাংশ ও মুরগি ২২ শতাংশ।

সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হয়।

গবেষণার পর্যবেক্ষণের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন পরিকল্পনায় এখনো তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো বছর কোনো পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কোনো বছর অতিরিক্ত উৎপাদন হয়। এতে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও স্বীকার করেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজি একটি বাস্তব সমস্যা। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ চাঁদাবাজি বন্ধের কথা বলেন, আমি বলি ‘আনঅ্যাকাউনটে›’ খরচ কমাতে হবে। আমরা উৎপাদনের শুরু থেকে বাজার পর্যন্ত আসা পর্যন্ত প্রতিটি স্তর চিহ্নিত করছি, কোথায় সমস্যা আছে।’
সংলাপে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, শুধু কর কমিয়ে বাজারে পণ্যের দাম কমানো যায় না। এর জন্য সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে কর ছাড়ের সুফলও ভোক্তারা পাবেন না।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি শোয়াইব চৌধুরী কৃষিপণ্যের দাম কমাতে রাতে যাত্রীবাহী রেলে বাড়তি বগি দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ করে দেয়ার অনুরোধ করেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সিপিডি’র সুপারিশ: মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে কৃষক সমবায় ও সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা। প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় করে অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। পচনশীল পণ্যের অপচয় কমাতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। প্রতিদিনের পাইকারি ও খুচরা বাজারের দর প্রকাশ্যে প্রদর্শনের মাধ্যমে বাজার সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন